
নারায়ণগঞ্জ যেন এক হকারদের অভয়ারণ্য। বিশেষ করে ১নং রেল গেইট থেকে কালিরবাজার পর্যন্ত সড়কটির দিকে তাকালে বোঝার উপায় নেই এটি কোনো শহরের প্রধান রাস্তা নাকি হকারদের নিজস্ব বাজার। সড়কের প্রায় ৬০ শতাংশই এখন হকারদের দখলে। দিনের পর দিন এই দখলদারিত্ব চললেও জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং সিটি কর্পোরেশনের নিরবতা ও ব্যর্থতা নিয়ে এখন সাধারণ মানুষের মনে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ১নং রেল গেইট থেকে কালিরবাজার মোড় পর্যন্ত যেতে যে কারো নাভিশ্বাস ওঠার দশা। রাস্তার দু’পাশে শুধু এক সারি নয়, বরং ৩ থেকে ৪ স্তরে বসানো হয়েছে চকি, ভ্যানগাড়ি আর মালামালের টুকরি। ফুটপাত তো বহুকাল আগেই হাতছাড়া হয়েছে, এখন হকারদের থাবা বসেছে পিচঢালা রাস্তার মাঝ বরাবর। এই এলাকায় হাঁটার জন্য ন্যূনতম জায়গাটুকুও অবশিষ্ট নেই। ফলে নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনের মাঝ দিয়ে ধাক্কাধাক্কি করে চলতে হচ্ছে।
শহরের এই বিশৃঙ্খল অবস্থার জন্য সাধারণ মানুষ সরাসরি দায়ী করছেন তিনটি কর্তৃপক্ষকে। এদের মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজ হলো নাগরিকদের চলাচলের রাস্তা পরিষ্কার রাখা। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে দায়সারা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েক ঘণ্টা পরই আবার আগের চিত্র ফিরে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হকারদের পুনর্বাসনের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর এই এলাকাটিকে নরকে পরিণত করা হয়েছে।
এদিকে, রাস্তার উপর ভ্যানগাড়ি আর চকি বসিয়ে যখন জনচলাচল স্থবির করে দেওয়া হয়, তখন ট্রাফিক পুলিশ বা থানা পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেয় না-সেই প্রশ্ন এখন সবার মুখে। অভিযোগ রয়েছে, এই হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা বা চাঁদা আদায় হয়, যার একটি বড় অংশ বিভিন্ন মহলে চলে যায়। আর এই ‘মানি গেম’-এর কারণেই পুলিশ প্রশাসন এসব দেখেও না দেখার ভান করে থাকে।
অপরদিকে, জেলা প্রশাসক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের মূল দায়িত্ব হলো আইন-শৃঙ্খলা ও জনস্বার্থ রক্ষা করা। অথচ কালিরবাজারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি তাদের নজরে আসছে না। ভিআইপি মুভমেন্ট ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো মোবাইল কোর্ট বা শক্ত অভিযান দেখা যায় না।
রাস্তা দখল করেই হকাররা ক্ষান্ত নয়, তাদের বিরুদ্ধে ক্রেতাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এক নারী ক্রেতা অভিযোগ করেন, কালিরবাজার এলাকায় জুতার দাম নিয়ে সামান্য দরদাম করায় হকার তার সাথে অত্যন্ত অশালীন আচরণ করেন। ফুটপাতে দোকান করা মানেই কি অভদ্রতা করার লাইসেন্স পাওয়া?-এমন প্রশ্ন সাধারণ ক্রেতাদের। মানুষের যাতায়াতের পথ আটকে ব্যবসা করবেন, আবার সেই মানুষের সাথেই খারাপ ব্যবহার করবেন, এই স্পর্ধা তারা পায় কোথায়?
নারায়ণগঞ্জবাসী এখন ক্লান্ত। তারা বলছেন, “আমরা নিয়মিত ট্যাক্স দেই, কিন্তু রাস্তায় শান্তিতে হাঁটতে পারি না। জেলা প্রশাসন, পুলিশ আর সিটি কর্পোরেশনের এই ‘লুকোচুরি খেলা’ আর কতদিন চলবে?” হকারদের কারণে তৈরি হওয়া এই কৃত্রিম যানজটে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকে থাকছে। এই দায় কি প্রশাসন এড়াতে পারবে?
নারায়ণগঞ্জ ১নং রেল গেইট থেকে কালিরবাজার পর্যন্ত এলাকাটি যেন এখন একটি অরাজকতার রাজত্ব। সাধারণ মানুষের দাবি, আর কোনো ফাঁকা প্রতিশ্রুতি নয়; অবিলম্বে জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং সিটি কর্পোরেশনকে সমন্বয় করে একটি স্থায়ী সমাধান করতে হবে। হকারদের উচ্ছেদ করা হোক-মানুষ চায় তাদের চলাচলের ফুটপাত ও রাস্তা। প্রশাসনের নমনীয়তা কি কোনো বিশেষ স্বার্থ রক্ষায়, নাকি তারা আসলেই এই চক্রের কাছে অসহায়? নারায়ণগঞ্জবাসী এখন এই প্রশ্নের উত্তর চায়।







