
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু। দলীয় মনোনয়ন ইস্যুতে তার অবস্থানকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ বাড়ছে। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, টিপু আসলে কাকে চান, কিংবা তার নিজস্ব অবস্থান কতটা সুসংগত?
দলীয় সূত্রে জানা যায়, একদিকে টিপু নিজেই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। অন্যদিকে, আড়াইহাজারের এমপি নজরুল ইসলাম আজাদের ভাই রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দেখতে আগ্রহী বলেও তার ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদকেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সামনে আনার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একাধিক প্রার্থী নিয়ে এই বহুমুখী অবস্থানকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক দ্বিমুখিতা’ হিসেবে দেখছেন।
এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে যখন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দলীয় উচ্চ পর্যায়ের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই আসন্ন নির্বাচনের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার মাধ্যমে সাখাওয়াত হোসেন খান কার্যত দলীয় মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে গেছেন এবং এটি একটি স্পষ্ট বার্তা।
সাখাওয়াত হোসেন খান দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে পরীক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য একটি নাম। আইনাঙ্গনের রাজনীতিতে তার সাফল্য সুপরিচিত; তিনি একাধিকবার জেলা আইনজীবী সমিতি, সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তৃণমূলের সঙ্গে তার দৃঢ় সম্পর্ক এবং সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে একটি শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এমনকি প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশেও তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে উল্লেখযোগ্য ভোট অর্জন করেছিলেন, যা তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু দলীয় এই বাস্তবতার মধ্যেও টিপুর প্রতিক্রিয়া প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাখাওয়াতকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরপরই টিপু তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেইজে হতাশা প্রকাশ করে একাধিক পোস্ট দেন, যা অনেক নেতাকর্মীর কাছে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী’ আচরণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। এতে করে তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন দলেরই একাংশ।
নেতাকর্মীরা মনে করছেন, একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে টিপুর উচিত ছিল দলীয় সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো এবং ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া। কিন্তু তার বিপরীত অবস্থান দলের অভ্যন্তরে বিভক্তি তৈরির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে যখন দল একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে, তখন এমন আচরণকে অনেকেই অপ্রত্যাশিত বলে মনে করছেন।
রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন ঐক্য এবং গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব। সেই জায়গায় সাখাওয়াত হোসেন খানকে একজন যোগ্য, অভিজ্ঞ ও ত্যাগী নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যিনি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে জনগণের আস্থা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি নির্বাচনে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, টিপুর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তাকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে এবং তার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অন্যদিকে, সাখাওয়াত হোসেন খানের ধারাবাহিকতা, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা তাকে বিএনপির সম্ভাব্য মুখ হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এখন দেখার বিষয়, দলীয় নেতৃত্ব এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয় এবং শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন কার হাতে যায়।







