
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সচেতন মহলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, এনসিপি যদি একটি স্বতন্ত্র ও পৃথক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দলটির পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে জনপ্রিয়তা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো নতুন রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজস্ব আদর্শিক অবস্থান, স্বতন্ত্র নেতৃত্ব ও আলাদা রাজনৈতিক ব্র্যান্ড তৈরি করা। এনসিপির ক্ষেত্রে সেই জায়গায় এখনো এক ধরনের অস্পষ্টতা বিদ্যমান। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী–এর সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ বা ঘনিষ্ঠতা এনসিপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
সচেতন মহলের অভিমত হলো, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে থাকলে এনসিপির নিজস্ব পরিচয় ও রাজনৈতিক ব্র্যান্ড গড়ে ওঠার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাবে। কারণ, জামায়াতে ইসলামীর একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, সুসংগঠিত কাঠামো এবং স্পষ্ট আদর্শিক পরিচয় রয়েছে। সেই বৃহৎ ও পুরনো রাজনৈতিক বলয়ের ছায়ায় থাকলে এনসিপি আলাদা করে জনগণের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারবে না। বরং এনসিপি তখন একটি ‘সহযোগী শক্তি’ বা ‘ছায়া রাজনৈতিক দল’ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণ ও সচেতন ভোটারদের একটি বড় অংশ এখন প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা থেকে বেরিয়ে বিকল্প শক্তির দিকে তাকিয়ে আছে। এই জনগোষ্ঠী নতুন রাজনীতিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারকে প্রাধান্য দিতে চায়। এনসিপি যদি এই চাহিদাকে সামনে রেখে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে, তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই দলটি গণমানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হতে পারে।
তবে এর জন্য এখনই স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এনসিপিকে নিজেদের নীতি, কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কাঠামো জনসমক্ষে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ ও কৌশলগত অবস্থান নিতে হবে, যাতে কোনো দলের রাজনৈতিক পরিচয়ে তারা বিলীন না হয়ে যায়।
সচেতন মহলের মতে, পৃথক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে এনসিপি জনগণের কাছে একটি নতুন আশা ও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যদিকে, জোটনির্ভর বা ছায়া রাজনীতির পথ বেছে নিলে দলটির বিকাশ থমকে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। ফলে এনসিপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তারা কি নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতে প্রস্তুত, নাকি প্রচলিত রাজনৈতিক বলয়ের অংশ হয়েই সীমাবদ্ধ থাকতে চায়? রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্তই আগামী দিনে এনসিপির উত্থান বা স্থবিরতার দিক নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।







