রমজান ঘিরে নারায়ণগঞ্জে অভিযানের ‘মহড়া’: আড়ালে থাকছেন নেপথ্যের রাঘববোয়ালরা

রমজান ঘিরে না’গঞ্জে অভিযানের মহড়া

2
নারায়ণগঞ্জে প্রশাসনের ভেজাল বিরোধী অভিযানের দৃশ্য।
রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন খাদ্য কারখানায় অভিযান চালাচ্ছে প্রশাসন, তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন অনেক।

পবিত্র মাহে রমজান ঘনিয়ে আসতেই নারায়ণগঞ্জের অলিগলি আর বিপণিবিতানে শুরু হয়েছে প্রশাসনের ‘সাঁড়াশি’ অভিযান। গত কয়েকদিনে ফতুল্লার সুইট নেশন, মুসলিমনগরের আল সামি ব্রেড, কিংবা শহীদ নগরের সেমাই কারখানায় জরিমানা ও মালামাল জব্দ করার খবর গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হচ্ছে। কিন্তু এসব অভিযান নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধছে হাজারো প্রশ্ন। সচেতন নাগরিক ও ভোক্তাদের দাবি-সারা বছর ঘুমিয়ে থেকে রমজান এলে প্রশাসনের এই তৎপরতা কেবলই ‘আইওয়াশ’ বা লোকদেখানো মহড়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

অভিযানগুলোতে দেখা যায়, ল্যাবে পরীক্ষার পর মানহীন পণ্য বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের দায়ে লাখ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এসব অপরাধী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নাম কখনোই জনসম্মুখে প্রকাশ করে না প্রশাসন।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা বড় অঙ্কের অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের কারণে মালিকদের নাম আড়ালে রাখা হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন বা ভোক্তা অধিকার আইনে কড়া শাস্তির বিধান থাকলেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানার পরিমাণ এতটাই নগণ্য যে, একে ভোক্তাদের সাথে এক ধরণের ‘রসিকতা’ হিসেবেই দেখছেন সাধারণ মানুষ। বড় বড় কোম্পানির কয়েক কোটি টাকার ব্যবসার বিপরীতে মাত্র ৫০ হাজার বা এক লাখ টাকা জরিমানা তাদের কাছে কেবল ‘ব্যবসায়িক খরচ’ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করা নিয়ে প্রশাসনের নানা হাঁকডাক শোনা গেলেও বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। চাষাড়া থেকে শুরু করে শহরের প্রধান প্রধান এলাকায় সুগন্ধা, হোয়াইট হাউস, সুমাইয়া, মনির, আনন্দসহ নামী-দামী হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো ফুটপাত দখল করে স্থায়ীভাবে ইফতার বাজার বসিয়েছে। সাধারণ পথচারীদের চলাচলের জায়গা দখল করে এসব বড় বড় ব্যবসায়ীরা রাজত্ব চালালেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। অভিযোগ রয়েছে, এসব হোটেল মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের গায়ের ওপর হাত দেয় না প্রশাসন।

রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে মানহীন সেমাই ও ঈদ সামগ্রী তৈরির যেন মহোৎসব শুরু হয়। লোকদেখানো দু-একটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করে প্রশাসন। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন-যেই বড় শোরুমগুলো থেকে এই নিম্নমানের পণ্য বিক্রি হয়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়? পল বেকার্স, ব্লিস বাইট, সুগন্ধা বেকারী, চিটাগাং বেকারী কিংবা ফুড ল্যান্ডের মতো শোরুমগুলোতে কেন নিয়মিত অভিযান চালানো হয় না? ভোক্তাদের দাবি, আড়ালে বিশাল অংকের অর্থের বিনিময়ে বড় বড় বিক্রেতাদের ছাড় দেওয়া হয় এবং মাঝেমধ্যে নামমাত্র দু-একটি ছোট কারখানাকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়।

চাষাড়া মোড়ে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল হাসান ক্ষোভের সাথে বলেন, “সারা বছর ধরে এই বিষাক্ত খাবারগুলো আমরা খাচ্ছি, তখন ম্যাজিস্ট্রেটরা কোথায় থাকেন? রমজান আইলে ওনারা ক্যামেরার সামনে জরিমানা করে ক্রেডিট নিতে আসেন। আর জরিমানা করে লাভ কী? মালিকরা তো জেলেই যায় না, নামও আসে না। পরদিন ওই একই নোংরা পরিবেশে আবার সেমাই তৈরি করে।”

নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহল মনে করেন, যদি নিয়মিত অভিযান না চলে এবং অপরাধীদের নাম প্রকাশ্যে এনে দৃষ্টান্তমূলক জেল-জরিমানা না করা হয়, তবে এই মৌসুমি অভিযান দিয়ে জনস্বার্থ রক্ষা সম্ভব নয়। প্রশাসন কি সত্যিই সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবছে, নাকি অভিযানের নামে কেবল পরিসংখ্যান ভারী করছে-এই প্রশ্ন এখন শহরের প্রতিটি কোণে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে এবং সাধারণ মানুষের এসব অভিযোগ ও ক্ষোভের বিষয়ে কথা বলতে নারায়ণগঞ্জ জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হৃদয় রঞ্জন বণিকের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া সম্ভব হয় নি।