
এলিট ক্লাবের সভাপতি থেকে রাতারাতি ‘অটোশ্রমিক নেতা’ বনে যাওয়া তোফাজ্জল হোসেন তাপুর ভোল পাল্টানোর খবর এখন নারায়ণগঞ্জের টক অব দ্য টাউন। বিশেষ করে শ্রম আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন ও তার অন্ধকার অতীত নিয়ে চারদিকে বইছে সমালোচনার ঝড়। তবে আইনি প্রশ্নে তোফাজ্জল হোসেন তাপু যে উত্তর দিয়েছেন, তা নিয়ে জনমনে নতুন করে হাস্যরস ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। আইন না মেনেও দাপটের সাথে ‘শ্রমিক নেতা’র চেয়ারে বসে থাকা তাপুর আসল উদ্দেশ্য নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১৮০ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কোনো ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকর্তা (সভাপতি, সম্পাদক ইত্যাদি) হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি না তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা শিল্পে নিযুক্ত বা কর্মরত একজন শ্রমিক হন। তোফাজ্জল হোসেন তাপু একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ডেভেলপার কোম্পানির মালিক হয়েও কীভাবে অটোশ্রমিকদের নেতা হলেন—এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
সংশ্লিষ্ট শ্রমিক হিসেবে কখনো কাজ করেছেন কি না—জানতে চাইলে তিনি উল্টো বলেন, “আপনি জেনে নিন কতো পারসেন্ট মানুষকে বা নেতাকে কাজ করতে হয়, আর কতো পারসেন্টকে কাজ করতে হয় না। আপনার প্রশ্নটা ঠিক না, আপনার তথ্যটাও ঠিক না।”
আইনের কোন ধারা অনুযায়ী শ্রমিক না হয়েও তিনি এই পদে আছেন, তা জানতে চাইলে তিনি সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “আমি জানাবো পরে, আপনি আইসেন।” এমনকি আইন বা নিয়ম জানেন কি না—এমন প্রশ্নে তার দাবি, “আমি জানি। তবে হুট করে প্রশ্ন করলে তো আর বলতে পারবো না, আপনি আইসেন আমি জানাবো।” আইনের প্রতি তার এই তাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণই বলে দিচ্ছে, তিনি ক্ষমতার জোরেই এসব পদ দখল করে আছেন।
তাপুর এই ‘শ্রমিক নেতা’ সাজার আড়ালে রয়েছে এক কালো অতীত। ২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর মধ্যরাতে ফতুল্লার ঐতিহ্যবাহী ইউনাইটেড ক্লাবে ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে জুয়া খেলারত অবস্থায় এই তাপুকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছিল। সে সময় তার জুয়াড়ি পরিচয় নারায়ণগঞ্জজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। এখানেই শেষ নয়, ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর হোসেন জুট মিলের এমডির কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও হুমকির মামলায় ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে।
শামীম ওসমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ও তার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত এই তাপু এখন নিজেকে বাঁচাতে মরিয়া। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর তিনি এখন বিএনপি ঘরানার শ্রমিক সংগঠনের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন। মূলত আওয়ামী তকমা ও অপরাধের আমলনামা আড়াল করতেই মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তিনি শ্রমিক সংগঠনের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন বারবার গ্রেফতার হওয়া জুয়াড়ি ও চাঁদাবাজ ব্যক্তিকে এলিট ক্লাবের সভাপতি পদে রাখা প্রতিষ্ঠানের জন্য চরম অবমাননাকর বলে মনে করছেন ইউনাইটেড ক্লাবের সাধারণ সদস্যরা। আভিজাত্য বজায় রাখতে না পারা এবং শ্রম আইন লঙ্ঘন করার দায়ে অবিলম্বে তাপুর সদস্যপদ ও সভাপতির পদ বাতিলের জোরালো দাবি উঠেছে।
শ্রম আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং অতীতের অপরাধ আড়াল করতে তাপুর এই ‘অটোশ্রমিক’ সাজা এখন সচেতন মহলের কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার। সাধারণ মানুষের দাবি—শ্রমিকদের মিছিলে এই ‘ছদ্মবেশী’ নেতার জায়গা হতে পারে না। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক সংগঠনের পবিত্রতা রক্ষায় প্রশাসন ও শ্রম দপ্তরের কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।







