এলিট ক্লাবের সভাপতি এখন ‘অটোশ্রমিক’ নেতা: আইনের তোয়াক্কা করছেন না শিল্পপতি তাপু

আইনের তোয়াক্কা না করে অভিজাত ক্লাবের সভাপতি

16
তোফাজ্জল হোসেন তাপু-র বিতর্কিত কর্মকাণ্ড।
শিল্পপতি ও এলিট ক্লাবের সভাপতি হয়েও শ্রমিক নেতা পরিচয় দিয়ে বিতর্কে তাপু।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিয়েছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী তোফাজ্জল হোসেন তাপু। একদিকে তিনি ফতুল্লার অত্যন্ত দাপুটে ও অভিজাত সংগঠন ‘দি ইউনাইটেড এসোসিয়েশন’ (ইউনাইটেড ক্লাব)-এর দীর্ঘদিনের সভাপতি এবং অতি-অভিজাত ‘নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেড’-এর একজন সদস্য; অন্যদিকে তিনি এখন রাজপথের সাধারণ অটোরিক্সা ও অটোটেম্পু শ্রমিকদের ‘ভাগ্যবিধাতা’। আভিজাত্যের আড়ালে তার এই হঠাৎ ‘অটোশ্রমিক’ পরিচয় ধারণ করা নিয়ে জেলাজুড়ে বইছে হাস্যরসের জোয়ার।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৮০ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কোনো ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকর্তা (সভাপতি, সম্পাদক ইত্যাদি) হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি না তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা শিল্পে নিযুক্ত বা কর্মরত একজন শ্রমিক হন। অর্থাৎ, অটোরিক্সা ও অটোটেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হতে হলে তাকে আইনত এই খাতের একজন সক্রিয় শ্রমিক হতে হবে। কিন্তু তোফাজ্জল হোসেন তাপু একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও ডেভেলপার কোম্পানির মালিক হয়েও কীভাবে ‘নারায়ণগঞ্জ জেলা অটোরিক্সা অটোটেম্পু শ্রমিক ইউনিয়ন’ (রেজি নং ৪০৪১)-এর জেলা সভাপতি এবং ‘নারায়ণগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন’ (রেজি নং ২৩০২)-এর সহ-সভাপতি পদে আসীন হলেন, তা নিয়ে বড় ধরনের আইনি প্রশ্ন উঠেছে। আইনত তার এই পদগ্রহণ শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং সরাসরি শ্রম আইনের লঙ্ঘন।

এদিকে, সর্বমহলে তোফাজ্জল হোসেন তাপু শামীম ওসমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ও তার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া তিনি ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামানের বেয়াই। অভিযোগ উঠেছে, ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর আওয়ামীলীগের পরিচয় মুছে ফেলতে নিজেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। নিজের আওয়ামী পরিচয় আড়াল করতে এবং মামলা থেকে বাঁচতে বিপুল অংকের টাকার বিনিময়ে বিএনপি ঘরানার শ্রমিক সংগঠনগুলোর শীর্ষ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি।

তাপুর অতীত রেকর্ড কোনো সুস্থ সমাজের সাথে খাপ খায় না। ২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর খোদ ইউনাইটেড ক্লাবেই ডিবি পুলিশের অভিযানে জুয়া খেলা অবস্থায় তিনি হাতেনাতে গ্রেফতার হন। ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর হোসেন জুট মিলের এমডির কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও হুমকির মামলায় ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে। এছাড়া ধর্মগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরীহ মানুষের জমি ও হিন্দু সম্পত্তি দখলের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিকবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

এলিট ক্লাবের সভাপতি হয়ে রাজপথের অটোশ্রমিক নেতা হওয়া নিয়ে ইউনাইটেড ক্লাবের সদস্যদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। সদস্যরা বলছেন, “এলিট ক্লাবের সভাপতি পদে আসিন থেকে তিনি আবার অটোরিক্সা শ্রমিকদের নেতা পরিচয় ব্যবহার করে একইসাথে ক্লাব সদস্যদের এবং সাধারণ অটোরিক্সা শ্রমিকদের সাথে প্রতারণা করছেন তাপু।” বিতর্কিত এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে অবিলম্বে তাপুর সদস্যপদ ও সভাপতির পদ বাতিলের জোরালো দাবি তুলেছেন ক্লাবের সাধারণ সদস্যরা।

এসব বিষয়ে তোফাজ্জল হোসেন তাপুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি গর্বের সাথেই নিজের দ্বৈত পরিচয় স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি ইউনাইটেড ক্লাবের সভাপতি, আমি একজন ডেভেলপার কোম্পানির মালিক, আমি একজন ব্যবসায়ী।” একইসাথে দুটি শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ পদে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “জ্বী, আমি দুটি শ্রমিক ইউনিয়নের একটির জেলার সভাপতি ও একটির সহ-সভাপতি। আমি শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করি, তাই শ্রমিক সংগঠনে আমাকে নেওয়া হয়েছে।”

একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হয়ে শ্রমিকের পদে আসীন হওয়া আইনিভাবে সাংঘর্ষিক কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি যেহেতু এই দেশের নাগরিক, তাই আমি শ্রমিক সংগঠনের সাথেও যুক্ত হতে পারি, এতে বাধা কোথায়?”

এছাড়া পলাতক সাবেক এমপি শামীম ওসমানের সাথে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে তার সহজ উত্তর, “আমি একজন সামাজিক লোক, একজন এমপি আসলে আমি কি তাকে ইন্টারেন্স (অভ্যর্থনা) দেব না?”

শিল্পপতির ড্রইংরুম থেকে অটোরিক্সার স্ট্যান্ড-তাপুর এই অবিশ্বাস্য ভোল পরিবর্তন ও আইনি লঙ্ঘন এখন টক অফ দ্য টাউন। আভিজাত্যের মুকুট মাথায় নিয়ে শ্রম আইন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের নেতা সাজা এই ‘বহুরূপী’ ব্যবসায়ীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহলে কঠোর সমালোচনা চলছে। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা এবং শ্রম আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।