খানপুর টার্মিনাল পোর্ট নারায়ণগঞ্জের ‘নাভি’তে নতুন মরণফাঁদ, ক্ষুব্ধ নারায়ণগঞ্জবাসী

পানগাঁওয়ের ৩৫০ কোটির লোকসান

4
খানপুর টার্মিনাল পোর্ট নারায়ণগঞ্জের ‘নাভি’তে নতুন মরণফাঁদ
খানপুর টার্মিনাল পোর্ট নারায়ণগঞ্জের ‘নাভি’তে নতুন মরণফাঁদ

একটি বন্দর যখন চালু করা হয়, আশা করা হয় সেটি দেশের অর্থনীতিতে গতি আনবে। কিন্তু কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ-টার্মিনাল গত ১২ বছরে গতির বদলে দিয়েছে কেবল ‘লোকসান’। আর সেই ব্যর্থতার রেশ কাটতে না কাটতেই নারায়ণগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র খানপুরে ১৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন একটি বন্দর নির্মাণের আয়োজন চলছে। নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানগাঁওয়ের ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে নারায়ণগঞ্জের হৃদপিণ্ডে এই প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়া মানে হলো ৩০ লাখ মানুষের শহরটিকে চিরতরে ‘মৃত ঘোষণা’ করা।

বন্দর যদি করতেই হয়, তবে তা শহরের ‘নাভি’ খানপুর থেকে সরিয়ে কাঁচপুর বা মুক্তারপুরের মতো সুবিধাজনক স্থানে নেওয়ার জোরালো দাবি তুলেছেন নারায়ণগঞ্জবাসী।

২০১৩ সালে কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে বিশাল আয়োজনে নৌ-টার্মিনালটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম থেকে আসা কন্টেইনারগুলো নৌপথে সহজে ঢাকায় পৌঁছাবে। কিন্তু উদ্বোধনের ১২ বছর পর হিসাব বলছে, এই প্রকল্প এখন সরকারের গলার কাঁটা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক যুগে পানগাঁও পোর্ট প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। বছরে এই পোর্টের পেছনে ক্ষতি হচ্ছে ২২ থেকে ২৫ কোটি টাকা। বিআইডব্লিউটিএ-কে দেওয়া ১৫৫ কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণও এখন পর্যন্ত ফেরত দিতে পারেনি এই বন্দর। বর্তমানে বন্দরের ২০ শতাংশ জায়গাও ঠিকমতো ব্যবহৃত হচ্ছে না। এমন অবস্থায় সম্প্রতি এটি পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে সুইজারল্যান্ডের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। প্রশ্ন উঠেছে, যে বন্দর অচল পড়ে আছে, তার থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে কেন আরেকটি নতুন বন্দর বানাতে হবে?

নারায়ণগঞ্জের খানপুর এলাকাটিকে বলা হয় শহরের নাভি বা কেন্দ্রবিন্দু। এখানেই ৩০০ শয্যার হাসপাতাল, অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকা। এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ঠিক মাঝখানে ১৮৫ কোটি টাকার কন্টেইনার ও বাল্ক টার্মিনাল করার সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলছেন স্থানীয়রা।

কেন এই প্রকল্পকে ‘মরণফাঁদ’ বলা হচ্ছে? ১. শহর হবে অচল: চাষাড়া থেকে ২নং রেলগেট পর্যন্ত এখন রিকশা চলতেই হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে যদি ৪০-৫০ টন ওজনের দানবীয় কন্টেইনার লরি দিনরাত চলাচল শুরু করে, তবে পুরো শহর ২৪ ঘণ্টা স্থবির হয়ে থাকবে।
২. স্বাস্থ্যঝুঁকি: প্রস্তাবিত বাল্ক টার্মিনালে কয়লা, বালু ও সিমেন্ট খালাস করা হবে। এর বিষাক্ত ধূলিকণা বাতাসে মিশে সংলগ্ন ৩০০ শয্যা হাসপাতালের রোগী ও এলাকাবাসীর ফুসফুস নষ্ট করে দেবে।
৩. রাস্তা ও পাইপলাইন ধ্বংস: বিশাল ওজনের লরি চলাচলের ভার শহরের ভেতরের সরু রাস্তাগুলো সইতে পারবে না। ফলে ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও পানির লাইন ফেটে বড় ধরণের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজ স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা উন্নয়নের বিরোধী নয়, কিন্তু উন্নয়নের স্থানটি হওয়া চাই যৌক্তিক। ‘ওয়ার্কিং ফর বেটার নারায়ণগঞ্জ’-এর প্রধান সমন্বয়কারী ও জনপ্রিয় সাবেক কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ এবং অন্যান্য নাগরিক নেতারা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের দাবি:

কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় বিআইডব্লিউটিএ-র প্রচুর জায়গা রয়েছে। এখান থেকে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ব্যবহার করা সম্ভব, যা সারা দেশে পণ্য পরিবহনে সবচেয়ে সুবিধাজনক।

মুন্সিগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ সীমান্তবর্তী মুক্তারপুর বা ঢাকেশ্বরী এলাকায় নদী সংলগ্ন প্রশস্ত জায়গা রয়েছে। সেখানে পোর্ট করলে নাগিনা জোহা সড়ক দিয়ে সহজেই লরিগুলো চলাচল করতে পারবে, ফলে শহরের ভেতর কোনো যানজট তৈরি হবে না।

এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই একাট্টা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সব সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, “বিগত সরকারের আমলে কেবল অর্থ আত্মসাতের জন্য অনেক অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পানগাঁও থাকতে খানপুর পোর্ট তেমনই একটি লুটপাটের প্রজেক্ট।”

গত রোববার নাগরিক আন্দোলনের একটি প্রতিনিধিদল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেনের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে এই প্রকল্প বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসক জানিয়েছেন, জনগণের এই যৌক্তিক আপত্তির কথা তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জবাসী উন্নয়ন চায়, কিন্তু সেই উন্নয়নের নামে নিজের বাসযোগ্য শহরটিকে ধ্বংস হতে দিতে রাজি নয়। পানগাঁওয়ের ৩৫০ কোটি টাকার লোকসান প্রমাণ করে যে, অপরিকল্পিত প্রকল্প দেশের কোনো কাজে আসে না। এখন প্রশ্ন হলো, প্রশাসন কি পানগাঁওয়ের সেই একই ভুল নারায়ণগঞ্জে করবে, নাকি জনস্বার্থে এই ‘মরণফাঁদ’ সরিয়ে কাঁচপুর বা মুক্তারপুরে নিয়ে শহরটিকে বাঁচাবে? নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা দরকার—শহর চলে তার মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়ার সুস্থ পরিবেশ দিয়ে, কেবল ইটের দালান বা বন্দরের আয় দিয়ে নয়।