শহরের প্রাণকেন্দ্র খানপুরে কোনো টার্মিনাল চায় না নারায়ণগঞ্জবাসী

এই টার্মিনাল ঘিরে শহর জুরে চরম বিতর্ক এবং ক্ষোভ

10

নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর এলাকায় ১৮৪ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে একটি অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ও বাল্ক টার্মিনাল নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। মঙ্গলবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৪ কোটি ৯১ লাখ ৫৭ হাজার ৮০৯ টাকা।

সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, টার্মিনালটি নির্মিত হলে নদীপথভিত্তিক পণ্য পরিবহন আরও গতিশীল হবে, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়বে এবং ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের জন্য বিকল্প লজিস্টিক সুবিধা তৈরি হবে। বিশেষ করে সিমেন্ট, সার, খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন শুকনা বাল্ক পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রকল্পটি ঘিরে নারায়ণগঞ্জে দেখা দিয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের একাধিক সভায় নাগরিক প্রতিনিধিরা প্রকল্পটির বিরুদ্ধে আপত্তি ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ শহরের ভেতরে এ ধরনের বড় টার্মিনাল নির্মাণ হলে ভারী যানবাহনের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বর্তমানে শহরের প্রধান সড়কগুলোতে যে তীব্র যানজট নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তা আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

নাগরিক প্রতিনিধিরা আরও বলেন, খানপুর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও এলাকায় একটি অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল ইতোমধ্যে চালু রয়েছে। সেখানে পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শহরের ভেতরে নতুন করে আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণ অর্থনৈতিকভাবে কতটা যুক্তিসংগত—সে প্রশ্নও তুলছেন তাঁরা। তাঁদের আশঙ্কা, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে স্থানীয় জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, খানপুরের টার্মিনালটি মূলত শুকনা বাল্ক পণ্যের জন্য পরিকল্পিত, যা পানগাঁওয়ের কন্টেইনার টার্মিনালের সঙ্গে পুরোপুরি এক ধরনের নয়। তাঁদের যুক্তি, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পণ্য আমদানি ও সরবরাহের চাপ দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় লজিস্টিক ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ না হলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবহন ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে, যা শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দেবে।

কর্মকর্তারা জানান, ‘খানপুরে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার এবং বাল্ক টার্মিনাল নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় প্যাকেজ (পূর্ত কাজ-৩) বাস্তবায়নের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে সাতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। দরপত্র যাচাই-বাছাই শেষে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ঢাকার ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে নির্বাচিত করা হয়েছে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তাদের সঙ্গে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

প্রকল্পের আওতায় সিমেন্ট, সার ও খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন শুকনা বাল্ক পণ্য সংরক্ষণের জন্য গুদাম ও ক্যানোপিসহ সিএফএস শেড নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ছয়তলা প্রশাসনিক ভবন, পানি সরবরাহ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ প্রধান বিদ্যুৎ লাইন, হাই মাস্ট টাওয়ার, সীমানা প্রাচীর এবং নিরাপত্তা আলোকায়ন ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। এতে সৌর বিদ্যুৎব্যবস্থা, লাইটনিং অ্যারেস্টার, টার্মিনালজুড়ে বিদ্যুতায়ন, রিচ ফর্কলিফট ট্রাক, আসবাবপত্র, সিসিটিভি এবং সমন্বিত ভবন ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকল্পটি প্রথম গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে সংশোধনের মাধ্যমে চলতি বছরের ১৮ জুন একনেক সভায় এটি অনুমোদন পায়। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর স্থান নির্বাচন ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। অন্যথায় প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফলের চেয়ে সামাজিক ও নগরজীবনের ক্ষতি বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় নাগরিকদের উদ্বেগ ও বাস্তব পরিস্থিতি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার তাগিদ দিচ্ছেন তাঁরা।