ছিনতাইকারীদের স্বর্গরাজ্য নারায়ণগঞ্জ: নেপথ্যে মাদক

স্পটগুলোতে অভিযানের দাবি

2
নারায়ণগঞ্জে ছিনতাইকারী ও মাদক স্পট নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
নারায়ণগঞ্জে মাদকের প্রভাবে বাড়ছে ছিনতাই; অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ ও বিসিকের শ্রমিকরা।

মো. সাইফুল ইসলাম সায়েম: একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ এখন যেন ছিনতাইকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। দিন কিংবা রাত, শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ-কোথাও নেই নিরাপত্তা। সাধারণ পথচারী থেকে শুরু করে ফতুল্লা বিসিকের হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক প্রতিনিয়ত ছিনতাই আতঙ্কে দিন পার করছেন। এমনকি নিরাপদ নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীও। অপরাধ বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের মতে, নারায়ণগঞ্জে এই ভয়াবহ ছিনতাই বৃদ্ধির মূল কারণ হলো ‘মাদক’। নেশার টাকা জোগাড় করতেই মূলত কিশোর ও যুবসমাজ এই বেপরোয়া অপরাধে জড়াচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলা এখন মাদকে সয়লাব। শহর ও ফতুল্লাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অন্তত কয়েক হাজার মাদকের স্পট গড়ে উঠেছে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় রয়েছে একাধিক মাদক স্পট ও মাদক বিক্রেতা গ্যাং। হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা, ফেনসিডিল থেকে শুরু করে ড্যান্ডির মতো ভয়ংকর মাদক। নেশার ঘোরে এই ছিনতাইকারীরা এতটাই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ছে যে, সাধারণ মানুষ তো বটেই, খোদ পুলিশের ওপর হামলা চালাতেও তারা দ্বিধাবোধ করছে না।

ছিনতাইকারীরা কতটা বেপরোয়া, তার বড় প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি শহরের প্রাণকেন্দ্রে। ভোরে নগর ভবনের সামনে মন্ডলপাড়া ব্রিজ এলাকায় ডিউটিরত সহকারী উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এএসআই) লুৎফর রহমানের গতিরোধ করে তিন ছিনতাইকারী। দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তারা ওই পুলিশ কর্মকর্তার কোমরে থাকা ১৬ রাউন্ড গুলিভর্তি সরকারি পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

অবশ্য ঘটনার ২১ ঘণ্টা পর ছিনতাই হওয়া ওই পিস্তল ও গুলি বন্দর থানার র‌্যালী আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে দেওভোগ এলাকার চিহ্নিত অপরাধী মিশাল ওরফে বিশালকে, যার বিরুদ্ধে আগে থেকেই ধর্ষণ মামলা রয়েছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজে সশস্ত্র ছিনতাইকারীদের সামনে পুলিশ কর্মকর্তার কোনো প্রতিরোধ না করার বিষয়টি রহস্যজনক হওয়ায় তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ।

ছিনতাইয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং পুলিশের সময়মতো ব্যবস্থা নিতে না পারার কারণে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যার চরম পরিণতি দেখা গেছে সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি কড়ইতলা এলাকায়। সেখানে সকালে অটোরিকশা থামিয়ে ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে এক যুবককে ধরে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও। স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশ সময়মতো নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে নিজেদের পাহারার ব্যবস্থা করছে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন ফতুল্লা ও এর আশপাশের বিসিক শিল্পনগরীর শ্রমিকরা। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে পাড়া-মহল্লায় পাতি মাস্তানদের দাপটে সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষের চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিসিকের শ্রমিকরা ডিউটি শেষে বা বেতন পেয়ে বাড়ি ফেরার পথে প্রায়ই অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। শহরের দেওভোগ, বাবুরাইল, খানপুর, বরফকল, মাসদাইর, গলাচিপাসহ বিভিন্ন এলাকায় ‘বাবু বাহিনী’, রাসেল বাহিনীসহ একাধিক গ্যাং এই মাদক ও ছিনতাইয়ের সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, নারায়ণগঞ্জে ছিনতাইয়ের এই মহামারি থামাতে হলে সবার আগে মাদকের লাগাম টানতে হবে। মাদক স্পটগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত কেবল বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজনকে গ্রেপ্তার করে ছিনতাই রোধ করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, প্রশাসন যেন লোকদেখানো অভিযান বাদ দিয়ে মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারী গ্যাংয়ের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয় এবং শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে।