হকার ইস্যুতে আপসহীন নারায়ণগঞ্জবাসী

শহরের বাইরে পুনর্বাসন, ভেতরে জিরো টলারেন্স

5
হকার ইস্যুতে আপসহীন নারায়ণগঞ্জবাসী
হকার ইস্যুতে আপসহীন নারায়ণগঞ্জবাসী

রফিকুল ইসলাম জীবন:

নারায়ণগঞ্জে হকার ইস্যু এখন কেবল একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং নগরবাসীর জীবনযাত্রা, শৃঙ্খলা এবং নগর ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের জনআন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে হকার বসার কারণে চরম ভোগান্তিতে থাকা মানুষ এবার আর কোনো আপসের পথে হাঁটতে রাজি নয়। নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে একটি অভিন্ন মত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পুনর্বাসন করা যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই শহরের বাইরে পরিকল্পিতভাবে; শহরের ভেতরে কোনোভাবেই ফুটপাত দখল করে বসার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

গত কয়েক বছরে নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রধান সড়ক, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু সড়ক, চাষাঢ়া, দুই নম্বর রেলগেট এবং ফতুল্লাসহ আশপাশের এলাকাগুলো কার্যত হকারদের দখলে চলে যায়। এতে একদিকে যেমন পথচারীদের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, অন্যদিকে যানজট, দুর্ঘটনা, অপরাধপ্রবণতা এবং পরিবেশ দূষণও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে চলাচল করে, যা প্রতিনিয়ত জীবনঝুঁকি তৈরি করছে।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযান নগরবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করে। দীর্ঘদিন পর মানুষ ফুটপাত ফিরে পায়, যানজট কিছুটা কমে আসে এবং শহরের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে আসার ইঙ্গিত দেখা যায়। কিন্তু এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মাঝেই আবারও কিছু অসাধু চক্র ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় হকারদের পুনর্বাসনের নামে শহরের ভেতরেই বসানোর অপচেষ্টা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষ।

নগরবাসীর বড় একটি অংশ মনে করছে, হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টি একটি মানবিক ইস্যু হলেও সেটিকে কখনোই বিশৃঙ্খলার বৈধতা দেওয়ার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ফুটপাত ও সড়ককে কোনোভাবেই বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের সুযোগ রাখা যায় না। বরং শহরের বাইরে নির্দিষ্ট জায়গায় আধুনিক হকার মার্কেট বা নির্ধারিত জোন গড়ে তুলে তাদের পুনর্বাসন করা হলে সেটিই হবে টেকসই সমাধান।

বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে হকার সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘চক্রের’ মধ্যে আবদ্ধ। রাজনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি, প্রশাসনের দুর্বলতা এবং সমন্বয়ের অভাব—সব মিলিয়ে এটি একটি জটিল অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। ফলে মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। এখন যদি আবারও একই চক্র সক্রিয় হয়ে শহরের ভেতরে হকার বসানোর সুযোগ তৈরি করে, তাহলে সাম্প্রতিক সব অর্জন ভেস্তে যাবে।

এই প্রেক্ষাপটে নগরবাসী প্রশাসনের কাছে কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপ দাবি করছে। তারা মনে করছে, শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে থেমে গেলে হবে না; বরং নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে শহরকে স্থায়ীভাবে হকারমুক্ত রাখতে হবে। একইসঙ্গে শহরের বাইরে পুনর্বাসনের জন্য দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে হলে সড়ক ও ফুটপাতের অবাধ ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জ যেহেতু একটি শিল্পনগরী, এখানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত হয়। ফলে ফুটপাত দখল করে হকার বসানো শুধু জনদুর্ভোগই বাড়ায় না, বরং অর্থনৈতিক কার্যক্রমকেও ব্যাহত করে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জবাসীর অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও স্পষ্ট ও দৃঢ় হয়ে উঠেছে। তারা আর কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নয়। শহরের ভেতরে হকার বসানোর যেকোনো উদ্যোগকে তারা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে এবং এটিকে নগরের স্বার্থবিরোধী বলে মনে করছে। তাদের মতে, এখন সিদ্ধান্তের সময়—শহরকে পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য রাখা হবে, নাকি আবারও দখল ও বিশৃঙ্খলার হাতে তুলে দেওয়া হবে।