
রফিকুল ইসলাম জীবন: জাতীয় নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনী প্রচারে এসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, তিনি জানেন এই জেলায় অন্তত ২০টি মাদকের স্পট রয়েছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, তার দল ক্ষমতায় এলে নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে মাদক নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তারেক রহমান। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও নারায়ণগঞ্জে মাদক নির্মূলে দৃশ্যমান কোনো বড় বা ধারাবাহিক অভিযানের চিত্র দেখা যাচ্ছে না এমন অভিযোগ এখন সর্বত্র।
স্থানীয়দের মতে, প্রধানমন্ত্রী যে ২০টি স্পটের কথা বলেছিলেন, সেগুলো মূলত পাইকারি বা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। বাস্তবে নারায়ণগঞ্জ জেলার চিত্র আরও ভয়াবহ। এখন মাদক ব্যবসা আর নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই। প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লা, অলিগলি ও গ্রামাঞ্চলে ছোট-বড় অসংখ্য মাদক বিক্রির স্পট গড়ে উঠেছে। ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলের মতো মাদক এখন অনেক এলাকায় প্রকাশ্যেই কেনাবেচা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের সাতটি থানা সদর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁও সব এলাকাতেই প্রায় একই চিত্র। কোথাও নির্দিষ্ট সময় ধরে, কোথাও আবার বাসা-বাড়ি বা দোকানের আড়ালে মাদক বিক্রি চলছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাদক ব্যবসায়ীরা এতটাই বেপরোয়া যে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না।
পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে কিছু মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করছে এবং মাদক উদ্ধারও হচ্ছে। কিন্তু এসব অভিযানকে স্থানীয়রা বলছেন বিচ্ছিন্ন ও অস্থায়ী। বড় চক্র বা মূল নিয়ন্ত্রকরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেক ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আবার আগের মতো ব্যবসায় ফিরে আসছে। ফলে মাদক নেটওয়ার্ক ভাঙার বদলে তা আরও বিস্তৃত হচ্ছে এমন অভিযোগ জোরালো হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সীকে ঘিরে জনমনে প্রত্যাশা বাড়ছে। কবে নাগাদ জেলাজুড়ে সমন্বিত ও কঠোর মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সাধারণ মানুষ। শুধু কয়েকটি এলাকা বা কয়েকজন খুচরা বিক্রেতাকে ধরলে যে মাদক পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না, তা এখন প্রায় সবারই জানা।
অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ চরমে। তাদের অভিযোগ, মাদকের সহজলভ্যতার কারণে তরুণ ও কিশোর সমাজ দ্রুত ধ্বংসের পথে যাচ্ছে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও মাদক চক্রের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। অনেক এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও নানা অপরাধও জড়িয়ে পড়ছে, যা পুরো জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে।
নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায় এখন সরকারের ওপর। প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেহেতু নারায়ণগঞ্জের মাদক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা বলেছিলেন, তাই এই জেলায় বিশেষ নজর দেওয়াই মানুষের প্রত্যাশা। নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই মাদক নির্মূলের সেই প্রতিশ্রুতি কবে বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি তা কেবল নির্বাচনী বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
এ বিষয়ে জানতে গতকাল পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সীকে টেলিফোন করা হলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন ঘোষনার কথা আমরা জানি। তাই নির্বাচনের আগে থেকেই মাদক নির্মূলে করনীয় নিয়ে আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। এরই মাঝে থানা পুলিশ এবং ডিবি পুলিশ অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক ব্যবসায়ীদের ধরা হচ্ছে এবং আরো বড় আকার অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। শিগগিরই মাদক ব্যবসা পূরোপূরি নিয়ন্ত্রনে চলে আসবে ইনশাআল্লাহ।







