নগরবাসীর চাহিদা পূরনে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে নাসিক প্রশাসক

0
অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান
অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান

নারায়ণগঞ্জ নগরী আজ বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল নজরদারি ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা অনিয়ম নগরজীবনকে কার্যত অচল করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান-এর সামনে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন-এর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার অর্থ শুধু একটি প্রশাসনিক পদ গ্রহণ নয়; বরং একটি ভেঙে পড়া নগর ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নগরীর সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের অবাধ চলাচল কার্যত নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ থাকলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। নগরবাসীর অভিযোগ, আইন প্রয়োগ মাঝে মাঝে দেখা গেলেও তা ধারাবাহিক নয়; ফলে দখলদার ও অবৈধ পরিবহন চক্র আগের মতোই সক্রিয় থাকে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নোংরা ও ময়লায় ভরা শহরের চিত্র। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় সড়কের পাশেই জমে থাকছে দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনা। ড্রেন পরিষ্কার না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ময়লার ভাগাড় থেকে ছড়াচ্ছে রোগজীবাণু। নগরবাসীর ভাষায়, “নারায়ণগঞ্জ এখন শিল্পনগরী নয়, ময়লার নগরীতে পরিণত হয়েছে।”

ময়লার এই অব্যবস্থাপনার সরাসরি ফল হিসেবে বেড়েছে মশার উপদ্রব। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নগরবাসী। সিটি করপোরেশনের নিয়মিত ফগিং ও লার্ভা নিধনের কোনো দৃশ্যমান কার্যকারিতা নেই বলে অভিযোগ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ও জমে থাকা পানিই মশার বংশবিস্তারকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গেছে।

নগরের আরেকটি ভয়াবহ সমস্যা হলো ফুটপাত দখল। যেসব ফুটপাত পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্মিত, সেগুলো এখন দোকান, হকার, ভাসমান বাজার ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। মানুষ বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে হাঁটছে, ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বহু দখলদার নিয়মিত চাঁদা দিয়ে বছরের পর বছর ফুটপাত দখল করে রেখেছে—যা নগর প্রশাসনের নীরবতার প্রশ্ন তোলে।

বাজার ব্যবস্থাপনাও একইভাবে চরম বিশৃঙ্খল। কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে পাইকারি বাজার—কোথাও নেই পরিকল্পনা, নেই স্বাস্থ্যবিধির মান। রাস্তার ওপর পণ্য ফেলে বেচাকেনা, অবৈধ গুদাম, নোংরা পরিবেশ—সব মিলিয়ে বাজারগুলো রোগের ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজার সিন্ডিকেট ও দখলদারদের বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সমস্যার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক শৈথিল্য ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়। কেবল অভিযান চালিয়ে বা সাময়িক উচ্ছেদ করে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন কঠোর সিদ্ধান্ত, নিয়মিত মনিটরিং এবং দখল ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি।

এই প্রেক্ষাপটে এডভোকেট সাখাওয়াৎ হোসেন খানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তিনি কি আদৌ এই দখলদার চক্র, অবৈধ পরিবহন ব্যবস্থা ও গড়ে ওঠা দুর্নীতির বলয় ভাঙতে পারবেন? নাকি আগের মতোই নগরবাসী কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নারায়ণগঞ্জে।

নগরবাসীর প্রত্যাশা স্পষ্ট। তারা আর প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তন চায়। যানজটমুক্ত সড়ক, পরিচ্ছন্ন শহর, মশামুক্ত পরিবেশ এবং নিরাপদ ফুটপাত—এই মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করাই এখন নতুন প্রশাসকের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নারায়ণগঞ্জ নগরী আজ একটি সিদ্ধান্তের মোড়ে দাঁড়িয়ে। এই সংকটকে সুযোগে রূপান্তর করা যাবে কি না, তা নির্ভর করছে প্রশাসকের কঠোরতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপের ওপর। নগরবাসী এখন তাকিয়ে আছে—এই চ্যালেঞ্জে এডভোকেট সাখাওয়াৎ হোসেন খান কতটা সফল হন, সেই দিকেই।

“আরও পড়ুন: পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন প্রশাসক