
নারায়ণগঞ্জ-দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। যে শহর থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায় রাষ্ট্র, যেখানে গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের শিল্পকারখানা। আর এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের অভিভাবক হিসেবে পরিচিত ‘নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (এনসিসিআই)। ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে এই সংগঠনটি আলোচনায় রয়েছে কখনো সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, কখনো বা বড় বড় স্বপ্নের কথা শুনিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে-দামী এসিরুমে বসে দেওয়া এসব প্রতিশ্রুতি কি আসলেও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি এনেছে, নাকি এটি কেবলই ‘লোকদেখানো’ কিছু উদ্যোগ?
চব্বিশের জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি এক ব্যতিক্রমী নির্বাচনের সাক্ষী হয় নারায়ণগঞ্জ। ১৯ জন পরিচালকসহ সভাপতি ও সহ-সভাপতি পদে সবাই নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান দিপু ভূঁইয়ার নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নানা চটকদার বক্তব্য দিয়ে আসছে। তার আগে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সিআইপি মাসুদুজ্জামান চাঁদাবাজদের থেকে টাকা উদ্ধার করে কিছুটা চমক সৃষ্টি করলেও পরবর্তীতে স্থায়ী কমিটির কাজে সেই গতি আর দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দিপু ভূঁইয়া কয়েকটি বড় প্রতিশ্রুতির কথা ঘোষণা করেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল-নারায়ণগঞ্জকে ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলায় উন্নীত করা এবং স্থানীয় কলকারখানায় অন্তত ৩০ শতাংশ স্থানীয় নাগরিকদের চাকরির সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু বছর পার হলেও জেলার বেকার যুবকদের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্থানীয়দের চাকরির বিষয়টি এখনও কেবল ‘সদিচ্ছার’ কথাতেই আটকে আছে, কোনো মালিকের ওপর এর বাধ্যবাধকতা আরোপে চেম্বারকে কঠোর হতে দেখা যায়নি।
শহরের সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো যানজট। সম্প্রতি চেম্বার ও বিকেএমইএর উদ্যোগে ১৫০ জন ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করা হয়েছে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে চালু করা হয়েছে ‘হটলাইন’। প্রথম নজরে এগুলো পজিটিভ মনে হলেও শহরের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন-এটি কি স্থায়ী সমাধান নাকি সাময়িক আইওয়াশ? ১৫০ জন ভলান্টিয়ার থাকার পরেও চাষাড়া, কালীরবাজার ও ২নং রেল গেইট এলাকার যানজট এক ইঞ্চিও কমেনি। ফুটপাত হকারদের দখলে, অবৈধ স্ট্যান্ডে রাস্তা বন্ধ-অথচ প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতাদের এই সংগঠনটি প্রশাসনের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। নাগরিকরা মনে করছেন, নিজেদের ব্যবসা রক্ষার জন্য তারা যতটুকু সক্রিয়, সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ সুগম করতে ততটাই উদাসীন।
নারায়ণগঞ্জ থেকে ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা মুনাফা করছেন। এখানকার মাটি ও পানি ব্যবহার করে তারা বিত্তশালী হচ্ছেন। কিন্তু জেলার পরিবেশ রক্ষা, শীতলক্ষ্যার দূষণ রোধ কিংবা আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে তাদের বিনিয়োগ নগণ্য। চেম্বার নেতারা প্রায়ই মেট্রোরেল বা বড় ফ্লাইওভারের স্বপ্ন দেখান, কিন্তু শহরের সাধারণ রাস্তা সংস্কারের কাজ যখন মাসের পর মাস আটকে থাকে, তখন তারা সিটি কর্পোরেশনকে চিঠি দিয়েই দায় সারেন। কোনো কঠোর পদক্ষেপ বা ফান্ড গঠন করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে তারা আগ্রহী নন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চেম্বার অব কমার্স বর্তমানে ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী ক্লাবে পরিণত হয়েছে। সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান দিপু ভূঁইয়া একইসাথে সংসদ সদস্য ও চেম্বার প্রধান হওয়ায় মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু ক্ষমতার এই কেন্দ্রীকরণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য হটলাইন খুললেও বড় আমদানিকারক ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে চেম্বারকে কোনো শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। রমজানের দোহাই দিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে যে উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, তা আদতে কতটুকু কাজ করছে তা বাজারে গেলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এখন এক ক্রান্তিকাল পার করছে। বক্তৃতা আর সভার টেবিলে যেসব স্বপ্ন তারা দেখাচ্ছেন, তার সাথে মাঠের বাস্তবতার ব্যবধান আকাশ-পাতাল। জেলাবাসী মনে করছেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে কোটি কোটি টাকা লাভ করা ব্যবসায়ীদের এই সংগঠনটি যদি সত্যিই আন্তরিক হতো, তবে অনেক আগেই বদলে যেত এই শহর। কেবল ১৫০ জন ভলান্টিয়ার বা একটি হটলাইন নম্বর দিয়ে হাজার বছরের পুরনো নাগরিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নারায়ণগঞ্জবাসী এখন আর কোনো ‘কথার ফুলঝুরি’ শুনতে চায় না, তারা চায় দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং ব্যবসায়ীদের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকৃত প্রতিফলন।







