অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে পারে জামায়াত-এনসিপি-ফেলাফত জোট

নির্বাচনের পর না.গঞ্জের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ

0

নিজস্ব প্রতিবেদক :

সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরীতে এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর সম্ভাব্য জোট রাজনীতি। জাতীয় নির্বাচনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই জোট কোন পথে এগোবে তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ। পর্যবেক্ষকদের মতে এই জনপদে জামায়াত-এননিপি-খেলাফত জোট এবারের নির্বাচনে যে ভোট পেয়েছে তাতে পরিস্কার বুঝা যায় আগমী নির্বাচনে এই জোটকে ঠেকিয়ে রাখা মোটেও সহজ হবে না।

প্রসঙ্গত এই জোট এবারের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মাঝে একটিতে জয়ী হয়েছেন এবং বাকী চারটিতে বিপুল ভোট পেয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপির এডভোকেট আবদুল্লা আলআমিন জিতেছেন। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ড. মুহম্মদ ইকবাল করিম ভুইয়া অল্প ভোটে হেরেছেন। বাকী দুটি আসনেও জামায়াতের প্রার্থীরা বিপুল ভোট পেয়েছেন। তাই আগামী নির্বাচনকে টার্গেট করে তারা যদি এখনই মাঠে সক্রিয় হন তাহলে জেলার পাঁচটি আসনেই তারা জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নারায়ণগঞ্জে বিরোধী রাজনীতিতে একধরনের পুনর্গঠনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখা, নতুন সমর্থক ভিত্তি তৈরি এবং ভোটের রাজনীতির বাইরে নাগরিক ইস্যুতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে সমন্বয়মূলক রাজনীতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী বরাবরের মতোই জাতীয় নির্বাচনের পর সংগঠনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে মনোযোগ দিচ্ছে। ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে কর্মীসমাবেশ, সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয় থাকার মাধ্যমে দলটি নিজেদের উপস্থিতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে। নাগরিক সমস্যা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নৈতিক রাজনীতির প্রশ্ন সামনে এনে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই এসব উদ্যোগ দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে এনসিপি নিজেদেরকে একটি তুলনামূলক নতুন ও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য, সুশাসন ও নগর ব্যবস্থাপনার উন্নয়নকে রাজনৈতিক ভাষ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে দলটি শহুরে তরুণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তি এবং এনসিপির নাগরিকভিত্তিক রাজনীতি একত্রিত হলে তা নারায়ণগঞ্জে একটি কার্যকর রাজনৈতিক জোটে রূপ নিতে পারে। তবে এই দুই দলের মঝে জামায়াত একটি ইসলামী দল এবং এনসিপি একটি স্যাকুলার মধ্যপন্থী দল হিসাবে পরিচিত।

তবে এই দলগুলির সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আদর্শিক অবস্থান, অতীত রাজনৈতিক ইমেজ, ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির চাপ সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এগোতে হবে এই জোটকে। জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি স্থানীয় রাজনীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, সেটিও তাদের ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি জামায়াত-এনসিপি জোট জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় সংঘাতমুখী রাজনীতি এড়িয়ে নাগরিক সমস্যা, কর্মসংস্থান, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা ও সুশাসনের মতো ইস্যুতে মনোযোগ দেয়, তবে তারা নারায়ণগঞ্জে একটি দৃশ্যমান বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন নারায়ণগঞ্জবাসী।

সব মিলিয়ে, জাতীয় নির্বাচনের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি এখন এক নতুন বাঁকে দাঁড়িয়ে। এই পরিবর্তনের ধারায় জামায়াত-এনসিপি জোট কোন পথে এগোয়, সেটিই আগামী দিনে জেলার রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।