
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট। পতন হয়েছে এক দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনের। নারায়ণগঞ্জ থেকে পালিয়েছেন এক সময়ের দাপুটে নেতা শামীম ওসমান। সাধারণ মানুষ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়েছিল, ভেবেছিল এবার হয়তো চিরতরে মুক্তি মিলবে চাঁদাবাজি আর ‘গডফাদার’ সংস্কৃতির অভিশাপ থেকে। কিন্তু ১৬ মাস পর আজ নারায়ণগঞ্জের রাজপথে বড় প্রশ্ন উঠেছে-আসলেই কি মুক্তি মিলেছে? না কি শুধুই মুখোশ বদলেছে? ওসমানের পতনের পর নারায়ণগঞ্জে এখন যে নতুন রাজত্ব শুরু হয়েছে, সেই নতুন গডফাদারদের থামাবে কে?
নারায়ণগঞ্জের অবৈধ আয়ের প্রধান উৎসগুলো এখন কার নিয়ন্ত্রণে? অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাস স্ট্যান্ড থেকে বালুর ঘাট, ঝুট ব্যবসা থেকে ফুটপাতের হকার-সবকিছুই এখন নিয়ন্ত্রণ করছে নিজেদের সবচেয়ে বড় দল দাবি করা একটি দলের নেতাকর্মীরা। অভিযোগ উঠেছে, এক সময় যারা শামীম ওসমানের ছায়াতলে থেকে দাপিয়ে বেড়াতো, তাদের অনেকেই আজ রাতারাতি ভোল পাল্টে এই নতুন নিয়ন্ত্রকদের ডানে-বামে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন-নারায়ণগঞ্জে কি তবে শুধুই ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে? সিন্ডিকেট কি শুধু তার গায়ের রং বদলেছে, কিন্তু মানুষের ভাগ্য কি বদলায়নি?
নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনেই এখন নতুন ৫ জন এমপি এবং সিটি কর্পোরেশনে রয়েছেন নতুন প্রশাসক। তাদের ঘিরে নগরবাসীর প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। মানুষ ভেবেছিল, নতুন এই প্রশাসন দখলবাজি আর সিন্ডিকেট রাজ চিরতরে গুঁড়িয়ে দেবে। কিন্তু এরই মাঝে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোরালো গুঞ্জন। অভিযোগ উঠেছে, খোদ এমপি ও প্রশাসকের অত্যন্ত কাছের কিছু মানুষই এখন শহরের বড় বড় বৈধ ও অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ৫ জন এমপি ও নাসিক প্রশাসকের সামনে এখন এটিই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা-তারা কি পারবেন এই নতুন ‘গডফাদার’দের থামাতে? না কি অদৃশ্য সিন্ডিকেটের চাপে তারাও শেষ পর্যন্ত অসহায় হয়ে পড়বেন?
এদিকে শিল্প এলাকা ফতুল্লার অবস্থা এখন সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ। সেখানে সরকারি দলের কোনো সরাসরি অভিভাবক বা এমপি না থাকায় ছোট-বড় অনেক নেতাই এখন নিজেকে এলাকার ‘রাজা’ ভাবতে শুরু করেছেন। বিসিকের ঝুট ব্যবসা আর তেলের ডিপো নিয়ে নতুন ও পুরাতন নেতাদের মধ্যে চলছে প্রকাশ্য কাড়াকাড়ি। সাধারণ ব্যবসায়ীরা এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন-তারা কার কথা শুনবেন আর কাকে চাঁদা দেবেন? তারা কি শান্তিতে ব্যবসা করতে পারবেন, নাকি এই অরাজকতা চলতেই থাকবে?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘শান্তি ও শৃঙ্খলার’ কড়া বার্তা মাঠ পর্যায়ের এই নতুন নিয়ন্ত্রকরা কতটা মানেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। নারায়ণগঞ্জবাসী এখন আর বুলি নয়, বাস্তব পরিবর্তন চায়। মানুষের দাবি একটাই-নারায়ণগঞ্জের রাজপথ যেন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের হয়, কোনো নতুন গডফাদারের দখলে না যায়। পুরোনো সেই ‘গডফাদার’ সংস্কৃতি কি নতুন চেহারায় ফিরে আসবে, না কি সুন্দর এক নারায়ণগঞ্জ গড়তে ৫ এমপি ও প্রশাসন সফল হবে? উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় এখন পুরো নারায়ণগঞ্জ।







