২২ মামলার আসামি রশিদকে পুনরায় চেয়ারম্যান করার পাঁয়তারা

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন! আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ

0
বক্তাবলী ইউনিয়ন পরিষদের অভিযুক্ত মেম্বার আব্দুর রশিদ এবং স্থানীয় মানুষের প্রতিবাদের চিত্র।
বক্তাবলী ইউনিয়ন পরিষদের বিতর্কিত সদস্য রশিদ মেম্বারকে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার পাঁয়তারায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা।

বক্তাবলী ইউনিয়ন আবারও এক গভীর সংকটের মুখে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র হত্যা মামলাসহ ২২টি মামলার আসামি, তিনবার জেল খাটা, এবং স্থানীয় মেম্বারদের উপর হামলা-হুমকির অভিযোগ ওঠা বিতর্কিত আব্দুর রশিদ মেম্বারকে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসী, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের অন্যান্য মেম্বারদের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা তাকে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা, যা এলাকায় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রশিদ মেম্বার তৎকালীন এমপি শামীম ওসমান ও স্থানীয় চেয়ারম্যান শওকত আলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর তিনি রাতারাতি বিএনপির ছায়াতলে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ইতি ঘটেনি। বৈষম্যবিরোধী একাধিক মামলায় পলাতক থাকার কারণে প্রথমে বরিশাল থেকে র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘদিন জেল খাটার পর জামিন পেয়ে তিনি বিএনপির নাম ভাঙিয়ে আবার বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে আবারও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আরেকটি মামলায় ফতুল্লা থানা পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে কয়েক মাস জেলে কাটান।

বারবার জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে আসার পর রশিদ মেম্বার পুনরায় বক্তাবলী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য নানা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। এই সময় ইউপি মেম্বাররা তাকে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান না করতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত আবেদন জানান। তাদের অভিযোগ ছিল, রশিদ মেম্বারের অতীত কর্মকাণ্ড, অপকর্ম এবং তার বিরুদ্ধে থাকা অসংখ্য মামলা তাকে জনপ্রতিনিধির পদে থাকার অযোগ্য করে তোলে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথমে ইয়াসির আরাফাত রুবেল নামে একজন কর্মকর্তাকে ৬ মাসের জন্য প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশাসকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর হাইকোর্টের একটি রায়কে পুঁজি করে রশিদ মেম্বার আবারও চেয়ারম্যান হতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হলো, এলাকার প্রায় সকল মেম্বার ও সাধারণ মানুষের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা রশিদ মেম্বারকে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করতে উঠেপড়ে লেগেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মেম্বার দাবি করেছেন, “সকলের আপত্তি সত্ত্বেও কেন তাকেই আবার চেয়ারম্যান করতে হবে? নিশ্চয়ই ডাল মেঁ কুছ কালা হ্যায়।” তারা অভিযোগ করেন, রশিদ মেম্বার মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছেন।

প্রশাসন হাইকোর্টের একটি রায়ের কথা বললেও, বিশ্লেষকরা বলছেন যে, হাইকোর্ট রশিদকে সরাসরি চেয়ারম্যান করার বিষয়ে কোনো রায় বা রুল জারি করেনি। তাই এত বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও ২২ মামলার আসামিকে পুনরায় চেয়ারম্যান করার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা প্রশাসনের কাছে নেই।

চেয়ারম্যান না হতেই রশিদ মেম্বার তার সহিংস আচরণ শুরু করেছেন। সম্প্রতি এক নারী মেম্বার হাসনা ভানুকে প্রকাশ্যে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হাসনা ভানু এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি জিডি (জিডি নং: ১৬৫৮, তারিখ: ২০/০১/২০২৬) দায়ের করেছেন। এছাড়াও, তার ইন্ধনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র হত্যা মামলার আরেক আসামি মহিউদ্দিন মেম্বার প্রকাশ্যে রাসেল মেম্বারকে লাথি মেরেছেন।

এলাকাবাসী আশঙ্কা করছে, যদি রশিদ মেম্বারকে পুনরায় চেয়ারম্যান করা হয়, তাহলে মেম্বারদের উপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়বে, যা যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। তারা মনে করেন, চেয়ারম্যানের পদ পেলে রশিদ মেম্বার ও তার বাহিনী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে, যা বক্তাবলীর শান্তি ও স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করবে।

বক্তাবলীবাসী এখন সরাসরি জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করছে। তারা দাবি জানিয়েছেন, রশিদ মেম্বারের মতো একজন বিতর্কিত ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে, ইউপি মেম্বারদের ভোট প্রদান বা সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী নতুন একজন যোগ্য ও ভালো মানুষকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হোক। জনগণের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। অন্যথায়, এলাকার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে তাদের গভীর শঙ্কা।