
রফিকুল ইসলাম জীবন:
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে নতুন একটি সমীকরণ দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরে দুটি শক্তিশালী বলয় সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বলয়ভিত্তিক অবস্থান আগামী দিনের নগর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
একপক্ষে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং আবুল কালামের রাজনৈতিক সচিব ও পুত্র আবুল কাউছার আশা। অপরদিকে অবস্থান নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ, মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু এবং বিশিষ্ট শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এই দুই বলয়ের রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন। বিশেষ করে বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে ঘিরে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশই এখন আলোচনার প্রধান বিষয়।
দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, দ্বিতীয় বলয়ের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে সাখাওয়াত হোসেন খানের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থিতার পথ কঠিন করে তোলা। এ লক্ষ্যে তারা বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে নজরুল ইসলাম আজাদের ভাই রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সামনে আনার চেষ্টা করছেন। যদিও নগর রাজনীতির অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, রাকিব এখনো নগরবাসীর কাছে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারেননি। একই সঙ্গে মাসুদুজ্জামান মাসুদ এবং অ্যাডভোকেট টিপুও সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশা করতে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এর আগেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে যেসব প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই ভবিষ্যতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনগণের জন্য কাজ করে জনসমর্থন অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে সাখাওয়াত হোসেন খানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম এবং তার পরিবারের সদস্যরা। ফলে সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বলয়টি ক্রমেই আরও সুসংগঠিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এরই মধ্যে সম্প্রতি আদালতপাড়ার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই বলয়ের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আইনজীবী মহলে আলোচিত ওই ঘটনায় মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর সঙ্গে অ্যাডভোকেট আবুল কালামের কন্যা ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট সামসুন্নুর বাধনের প্রকাশ্য মতপার্থক্য দেখা যায়। একজন নারী আইনজীবীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধে বাধন প্রকাশ্যে ওই নারী আইনজীবীর পক্ষে অবস্থান নেন এবং টিপুর অবস্থানের বিরোধিতা করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিগত বা পেশাগত মতবিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এর রাজনৈতিক প্রতিফলনও দেখা গেছে। ওই ঘটনার পর টিপুর সঙ্গে কালাম পরিবারের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়েছে বলে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। পরবর্তীতে টিপুও বিভিন্ন বক্তব্যে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আদালতপাড়ার এই ঘটনা বিএনপির অভ্যন্তরে বিদ্যমান দুই বলয়ের দ্বন্দ্বকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। আগে যে বিভাজনটি মূলত সাংগঠনিক ও নির্বাচনী কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফলে সময় যত গড়াচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অভ্যন্তরে দুটি বলয়ের মধ্যে দূরত্ব ও তিক্ততা বাড়ছে। আর এই পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীকে ঘিরে চলমান নীরব রাজনৈতিক লড়াই। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, স্থানীয় জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক শক্তির সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে নগর বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের চিত্র।







