চার কারনে মাদকের দৌরাত্ম্যে বিপর্যস্ত নারায়ণগঞ্জ

41
চার কারনে মাদকের দৌরাত্ম্যে বিপর্যস্ত নারায়ণগঞ্জ
চার কারনে মাদকের দৌরাত্ম্যে বিপর্যস্ত নারায়ণগঞ্জ

১) মাদক কারবারীদের লোকাল রাজনীতিবিদদের শেল্টার

২) গ্রেফতারের পর পুলিশের দূর্বল চার্জসিট ও গ্রেফতারে অনিহা

৩) গ্রেফতার হলেও দূর্বল বিচার ব্যবস্থার কারনে দ্রুত জামিন

৪) মাদক ব্যবসায়ীদের পক্ষে এক শ্রেনীর আইনজীবীর তৎপরতা

শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে মাদক এখন শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং অনেকের চোখে এটি একটি প্রভাব, অর্থ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমান্তরাল ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার অভিযোগ উঠছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান, গ্রেপ্তার, মামলা ও সংবাদ সম্মেলনের পরও কেন মাদক কারবার বন্ধ হচ্ছে না—এই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে ছোটখাটো বিক্রেতারা ধরা পড়লেও বড় কারবারি, অর্থদাতা ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বড় অংশকে অনেক সময় আইনের আওতায় আনা যায় না। ফলে কয়েকদিন পরপর একই মুখ, একই চক্র এবং একই অভিযোগ আবারও সামনে চলে আসে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। তাদের অভিযোগ, অভিযান ও গ্রেপ্তারের পর তদন্তে দুর্বলতা, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে ঘাটতি, মামলার নথি প্রস্তুতিতে অসংগতি এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল চার্জশিটের কারণে বিচারিক পর্যায়ে মামলাগুলো কাংখিতভাবে এগোয় না। অভিযোগ রয়েছে, যেসব মামলায় শক্ত তদন্ত ও তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন প্রয়োজন, সেখানে প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত পুরো মামলার ফলাফলে প্রভাব ফেলে।

একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগও আলোচনায় রয়েছে রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়া বড় পরিসরে মাদক ব্যবসা টিকে থাকা কঠিন। সমালোচকদের দাবি, কিছু এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে অপরাধী গোষ্ঠীর সম্পর্ক নিয়ে নানা অভিযোগ ও আলোচনা থাকলেও সেগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও দৃশ্যমান জবাবদিহি সবসময় দেখা যায় না। যদিও এসব অভিযোগ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রমাণিত নয় এবং দায় নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

এদিকে আদালত থেকে দ্রুত জামিন পাওয়ার বিষয়টিও জনআলোচনায় এসেছে। আইনি বাস্তবতায় জামিন আদালতের বিবেচ্য ও আইনসম্মত একটি অধিকার হলেও সমালোচকদের একটি অংশের প্রশ্ন—গুরুত্বপূর্ণ মাদক মামলাগুলোতে তদন্তের মান, মামলার উপস্থাপন এবং শুনানির প্রস্তুতি যথেষ্ট শক্তিশালী হচ্ছে কি না। তাদের মতে, যখন তদন্ত দুর্বল হয়, তখন বিচারিক পর্যায়ে মামলার অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরেকটি বিতর্কিত অভিযোগ ঘুরে ফিরে আসছে—কিছু আইনজীবী পেশাগত দায়িত্বের সীমা অতিক্রম না করেও ধারাবাহিকভাবে অভিযুক্তদের আইনি সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত জামিন আদায়ে সক্রিয় থাকেন, কিন্তু একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও জনস্বার্থভিত্তিক আইনি সহায়তা তুলনামূলক কম দৃশ্যমান থাকে। তবে আইনজীবীর পক্ষে আইনি প্রতিনিধিত্ব করা নিজেই কোনো অপরাধ বা অনিয়ম নয় এটি বিচার ব্যবস্থার স্বীকৃত অংশ।

স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই শুধু অভিযাননির্ভর হলে হবে না। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ, তথ্যনির্ভর তদন্ত, শক্তিশালী চার্জশিট, দ্রুত বিচার, সাক্ষী সুরক্ষা এবং বড় নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির বাস্তব পরিবর্তন কঠিন।

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই প্রতিদিন গ্রেপ্তার হচ্ছে কারা, আর রয়ে যাচ্ছে কারা? মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যদি কেবল মাঠের ছোট খেলোয়াড়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে মূল চক্র অক্ষত থেকেই যাবে; আর তার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে।