নারায়ণগঞ্জে পরিচ্ছন্ন ইমেজের তিন নেতার মূল্যায়ন: বিএনপিতে নতুন বার্তা

11

রফিকুল ইসলাম জীবন:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির বিরুদ্ধে একটি কথা প্রচলিত ছিল। অনেকেই বলতেন, বিএনপি ক্ষমতায় বা সুবিধাজনক অবস্থানে গেলে মাঠের কষ্ট করা ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারে না। দলের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করা অনেক নেতাই পদ বা দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বাদ পড়ে যান বলে একটা অভিযোগ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি সেই বদনাম থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় বড় নেতারা এখন সততা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর কেন্দ্রীয় এই নতুন বার্তার স্পষ্ট প্রমাণ এখন দেখা যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জে।

সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জের তিনজন শীর্ষ বিএনপি নেতাকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন—মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব।

তাদের মধ্যে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) প্রশাসক, অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং মাসুকুল ইসলাম রাজীবকে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (নউক) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন নেতার নতুন পদ পাওয়াটা শুধু সাধারণ কোনো সরকারি দায়িত্ব বণ্টন নয়; বরং এটি বিএনপির নতুন রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার প্রকাশ। কারণ এই তিনজন নেতাই দীর্ঘদিন ধরে দলের রাজনীতিতে কষ্ট করলেও কোনো ধরনের বিতর্ক, দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের দাগ তাদের গায়ে লাগেনি। দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও তাদের একটি ভালো ইমেজ বা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান: তিনি দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির হাল ধরে আছেন। দলের চরম বিপদের দিনগুলোতেও তিনি মাঠের রাজনীতি ছেড়ে যাননি। আইনজীবী হিসেবেও শহরে তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। তাই সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাকে প্রশাসক করায় শহরের অনেকেই খুশি হয়েছেন।

অধ্যাপক মামুন মাহমুদ: শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ দীর্ঘদিন ধরে জেলা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। শান্ত, মার্জিত ও পরিচ্ছন্ন নেতা হিসেবে শহরের মানুষ তাকে চেনে। জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে তার এই দায়িত্ব পাওয়াকে তার সততা ও যোগ্যতার বড় স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন সবাই।

মাসুকুল ইসলাম রাজীব: তরুণ ও কর্মঠ নেতা রাজীবকে নিয়ে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দ ও উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই নেতা আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে বড় ভূমিকা রেখেছেন। তাকে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (নাউক) চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্তকে ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি বড় ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন তরুণরা।

রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও যোগ্যতা ও ভালো ইমেজ দেখে দায়িত্ব দেওয়ার এই নতুন সংস্কৃতিকে দারুণভাবে স্বাগত জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ।

জাহাঙ্গীর আলম নামে চাষাঢ়ার এক ব্যবসায়ী বলেন, “দীর্ঘদিন পর এমন কিছু দায়িত্ব বণ্টন দেখলাম যেখানে বিতর্কিত কোনো মানুষকে সামনে আনা হয়নি। যারা দায়িত্ব পেয়েছেন তারা প্রত্যেকেই ভালো ইমেজের মানুষ। এতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশাসনের প্রতি আস্থা তৈরি হবে।”

মোস্তাফিজুর রহমান নামে ফতুল্লার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, “দলের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি যদি মানুষের সততা আর যোগ্যতা দেখা হয়, তবে কাজের মান বাড়ে। নারায়ণগঞ্জের এই তিন নেতার ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে বলে আমার মনে হয়।”

শারমিন আক্তার নামেসিদ্ধিরগঞ্জের এক গৃহিণী বলেন, “আমরা চাই বড় চেয়ারগুলোতে এমন মানুষ আসুক যারা সাধারণ মানুষের কথা শুনবে। নতুন দায়িত্ব পাওয়া এই নেতাদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা বেশ ভালো।”

মাহিন ইসলাম নামে এক তরুণ উদ্যোক্তা বলেন, “রাজনীতিতে ভালো ও সৎ মানুষের মূল্যায়ন হলে আমাদের মতো তরুণদের কাছে একটা পজিটিভ মেসেজ যায়। এতে সাধারণ তরুণদেরও রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বাড়ে।”

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যদি আগামী দিনেও এই একইভাবে যোগ্যতা, সততা ও জনগ্রহণযোগ্যতাকে সামনে রেখে নেতা মূল্যায়ন করা জারি রাখে, তবে দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের ভরসা অনেক বেড়ে যাবে। নারায়ণগঞ্জের এই ঘটনাটি দলের অন্য নেতা-কর্মীদের জন্যও একটি বড় বার্তা। আর তা হলো—দলের জন্য সততার সাথে কাজ করলে এবং জনগণের মন জয় করতে পারলে দিনশেষে সঠিক মূল্যায়ন পাওয়া সম্ভব। আর এই ইতিবাচক বিষয়টিই এখন পুরো নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।