ফতুল্লা নিয়ে ‘তামাশা’ চলছে! নাসিকের সীমানা সম্প্রসারণে বৈষম্যের অভিযোগ

ক্ষোভে ফুঁসছে বাদ পড়া এলাকাবাসী

163
ফতুল্লা নিয়ে ‘তামাশা’ চলছে! নাসিকের সীমানা সম্প্রসারণে ক্ষোভ
ফতুল্লা নিয়ে ‘তামাশা’ চলছে! নাসিকের সীমানা সম্প্রসারণে ক্ষোভ

রফিকুল ইসলাম জীবন:

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) সীমানা সম্প্রসারণের জন্য জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত তালিকায় কোথাও পুরো ইউনিয়ন, আবার কোথাও একই ইউনিয়নের কেবল একটি অংশ বা একটি ওয়ার্ডের অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, এ ধরনের খণ্ডিত সীমানা নির্ধারণ কোনো সুপরিকল্পিত নগরায়ণের উদাহরণ নয়; বরং এটি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তামাশা করার শামিল।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৭ জুলাই প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিতে কুতুবপুর ইউনিয়নের ১ থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সম্পূর্ণ এলাকা নাসিকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ফতুল্লা, কাশীপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের ক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছে ভিন্ন নীতি। এসব ইউনিয়নের কেবল নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা আংশিক এলাকা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর থেকেই বাদ পড়া এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, যখন একটি ইউনিয়ন সম্পূর্ণভাবে সিটি কর্পোরেশনের আওতায় নেওয়া হচ্ছে, তখন পাশের ইউনিয়নের একই ধরনের জনবসতি ও নগরায়িত এলাকাকে টুকরো টুকরো করে বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা কী—এই প্রশ্নের কোনো উত্তর প্রশাসন দেয়নি।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে এনায়েতনগর ইউনিয়ন নিয়ে। গণবিজ্ঞপ্তিতে ৮ নম্বর ওয়ার্ডকে সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব থাকলেও পাশের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ফতুল্লা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কেবল একটি অংশ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, অথচ একই ওয়ার্ডের অপর অংশ আগের মতোই ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকবে।

এ ধরনের সিদ্ধান্তে স্থানীয়দের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, একই ওয়ার্ডের একাংশ সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আর অন্য অংশ ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রম, নাগরিক সেবা, কর ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হবে।

বাদ পড়া এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এলে নাগরিক সুবিধা, উন্নত সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য নগর সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যেসব এলাকা বাদ যাচ্ছে, সেগুলো আবারও দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অনুন্নয়নের মধ্যেই পড়ে থাকবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফতুল্লার অধিকাংশ এলাকায় এখনো ভাঙাচোরা সড়ক, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবা নিত্যদিনের বাস্তবতা। ফলে বাদ পড়া এলাকাগুলোর মানুষ নিজেদের উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।

একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা সবাই সিটি কর্পোরেশনের আওতায় যেতে চাই। তাহলে একই ইউনিয়নের একাংশ নেওয়া আর আরেক অংশ বাদ দেওয়ার অর্থ কী? এটা আমাদের সঙ্গে ফাজলামো ছাড়া আর কিছু নয়।”

স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলেরও দাবি, সীমানা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একই থানার মধ্যে এমন খণ্ডিত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করবে। এতে একটি সড়কের একপাশ সিটি কর্পোরেশন এবং অন্যপাশ ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে চলে যেতে পারে, যা নাগরিক সেবা প্রদানকে আরও জটিল করে তুলবে।

এদিকে বাদ পড়া এলাকার বাসিন্দারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বর্তমান প্রস্তাব অপরিবর্তিত রেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তাঁরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন। তাঁদের দাবি, জনমত উপেক্ষা করে সীমানা নির্ধারণ করা হলে শিল্পনগরী ফতুল্লায় নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।

স্থানীয়দের প্রস্তাব, ফতুল্লা থানার আওতাধীন বক্তাবলী ইউনিয়ন ছাড়া কুতুবপুর, ফতুল্লা, কাশীপুর ও এনায়েতনগর—এই চারটি ইউনিয়নকেই সম্পূর্ণভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আনা উচিত। তাঁদের মতে, এতে প্রশাসনিক বিভ্রান্তি দূর হবে, পরিকল্পিত নগরায়ণ সহজ হবে এবং পুরো শিল্পাঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তবে জেলা প্রশাসনের গণবিজ্ঞপ্তিতে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেন কোথাও পুরো ইউনিয়ন এবং কোথাও আংশিক এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বিজ্ঞপ্তিতে কেবল সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের কাছ থেকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত আপত্তি ও পরামর্শ আহ্বান করা হয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, স্থানীয়দের এই ক্ষোভ ও আপত্তি প্রশাসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, নাকি বর্তমান প্রস্তাবই বহাল থাকে।