
দীর্ঘ ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারপ্রত্যাশীদের অপেক্ষায় রাখা নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী ও ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বী। তিনি জানিয়েছেন, যেকোনো মুহূর্তে এই মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল হতে পারে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সমাচারের সঙ্গে আলাপকালে রফিউর রাব্বী বলেন, তদন্তকারী সংস্থা থেকে তিনি এমন আশ্বাস পেয়েছেন যে, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে খুব শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হবে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, শুধু চার্জশিট দিলেই হবে না, সেটি যেন পূর্ণাঙ্গ, তথ্যভিত্তিক এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে হয়—সেই প্রত্যাশাই ভুক্তভোগী পরিবার ও নারায়ণগঞ্জবাসীর।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে মেধাবী শিক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডটি দেশব্যাপী তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। আন্দোলনের মুখে তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র্যাব এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, তাদের তদন্তে ত্বকীকে অপহরণের পর নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে এবং এই হত্যাকাণ্ডে ১১ জন অংশ নেয়। সেই সময় তদন্তকারী সংস্থা দাবি করেছিল, অচিরেই চার্জশিট দাখিল করা হবে। কিন্তু এরপর এক যুগেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়েনি।
এই দীর্ঘসূত্রতা ত্বকী হত্যা মামলাকে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম আলোচিত বিচারবিলম্বের প্রতীকে পরিণত করেছে। প্রতিবছর ৬ মার্চ ও ৮ মার্চ ত্বকীর পরিবার, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজ বিচার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। চলতি বছরও ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে একই দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
মামলার তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকাশিত তথ্য, র্যাবের সংবাদ সম্মেলন এবং আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নাম আলোচনায় আসে। ত্বকীর পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান, তাঁর ভাতিজা আজমেরী ওসমান, ছেলে অয়ন ওসমান এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী শাহ নিজামসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্তে উঠে আসা অভিযোগের যথাযথ আইনি প্রতিফলন চার্জশিটে থাকা উচিত। তবে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়া পর্যন্ত কার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হবে, সে বিষয়ে তদন্তকারী সংস্থা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
রফিউর রাব্বী বলেন, “আমরা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে শুধু একটি চার্জশিটের অপেক্ষায় আছি। তদন্ত তো অনেক আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন আমরা আশা করছি, আর কোনো বিলম্ব হবে না। প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হবে।”
আইনজীবীদের মতে, চার্জশিট দাখিল হওয়ার পর মামলাটি নতুন ধাপে প্রবেশ করবে। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হবে এবং এরপর সাক্ষ্যগ্রহণসহ বিচারিক কার্যক্রম এগোবে। তবে চার্জশিটে কারা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন এবং কী ধরনের অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজের ভাষ্য, ত্বকী হত্যা শুধু একটি পরিবারের সন্তানের হত্যাকাণ্ড নয়; এটি বিচারহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার একটি জাতীয় প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এই মামলার চার্জশিট শুধু একটি আইনি নথি নয়, বরং দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এদিকে গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ হওয়ার বিষয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। যদিও তদন্তকারী সংস্থা এখনো প্রকাশ্যে চার্জশিট দাখিলের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি, তবুও মামলার বাদীর বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—১৩ বছরের অপেক্ষার অবসান কি সত্যিই হতে যাচ্ছে? নাকি আলোচিত এই মামলার চার্জশিট আবারও কোনো অজানা কারণে পিছিয়ে যাবে? সেই উত্তর মিলতে পারে আগামী কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যেই।







