
কাশীপুর মাদ্রাসার হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাস্থ জামিআ মাদানিয়া কাসেমুল উলুম কাশীপুর মাদ্রাসার তহবিলের প্রায় ৮০ লাখ টাকার অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, শিক্ষকবৃন্দ ও হিসাব বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবির মুখে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে।
জানা গেছে, রাস্তা ও ভবনের অ্যাকোয়ার (অধিগ্রহণ) কাজের ক্ষতিপূরণ বাবদ মাদ্রাসার নামে প্রায় ৮৯ থেকে ৯০ লাখ টাকা আসে। বিগত কমিটির আমলে ১১ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন হলেও, বর্তমান কমিটির হাতে প্রায় ৬৯ লাখ টাকা এবং সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস কামালের সংগ্রহ করা ১১ লাখ টাকাসহ মোট প্রায় ৮০ লাখ টাকা গচ্ছিত ছিল।
তবে মুফতি জামালউদ্দিন (রঃ) ভবনের চার রুম ও ছাদ নির্মাণে প্রায় ৮০ লাখ টাকা খরচ দেখানো হলেও অফিসে কোনো সঠিক ভাউচার বা ক্যাশ বই সংরক্ষণ করা হয়নি। ব্যাংকের উত্তোলিত অর্থ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী দৈনিক ক্যাশ বইয়ে এন্ট্রি না করে, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস কামাল ও কোষাধ্যক্ষ আল-আমিন তাদের সুবিধামতো এককালীন টাকা তুলেছেন এবং পুরো বছরের খরচ একসাথে হিসাব দিয়েছেন।
আর্থিক নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, মেমোতে ইলেকট্রিক মালামাল বাবদ ৩ লাখ টাকা খরচ দেখালেও মিস্ত্রি বিল মাত্র ১৭ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। রাজমিস্ত্রির ৮ লাখ টাকা মজুরি কিসের ভিত্তিতে (স্কয়ার ফিট নাকি দৈনিক চুক্তি) দেওয়া হয়েছে, তার কোনো উল্লেখ নেই। এছাড়া একই দোকান থেকে একই পরিমাণ ইট বহনে ভিন্ন ভিন্ন পরিবহন ভাড়া দেখানোর প্রমাণ মিলেছে। অন্যদিকে, মাদ্রাসা ফান্ড থেকে গাছ ও বাগান বাবদ ৭০-৮০ হাজার টাকা অপ্রয়োজনীয় খরচ দেখানো হলেও মাদ্রাসার হেফজখানা ও নাজেরা বিভাগের ১৫০ জন শিক্ষার্থীর দুটি জরাজীর্ণ বাথরুম মেরামতে ফান্ড থেকে কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে বাথরুম দুটি মেরামত করেন।
হিসাব রক্ষকের বক্তব্য:মাদ্রাসার দীর্ঘ ৭-৮ বছর ধরে কর্মরত হিসাব রক্ষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
”সাধারণ কেনাকাটা ও বোডিং বাজারের হিসাব মুহতামিমের স্বাক্ষর শেষে নিয়মানুযায়ী ভাউচারের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হলেও নির্মাণ খাতের বড় অংকের খরচে কোনো নিয়মনীতি মানা হয়নি। ব্যাংক থেকে উত্তোলিত অর্থ দৈনিক ক্যাশ বইয়ে এন্ট্রি না করে পুরো বছরের খরচ একসাথে বছর শেষে ভাউচার আকারে দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস কামাল ও কোষাধ্যক্ষ আল-আমিন অফিসের নিয়ম পাশ কাটিয়ে নিজস্ব ক্ষমতায় এই লেনদেন পরিচালনা করেছেন। তৎকালীন সময়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অসচ্ছ এবং এর পেছনে কোনো দুর্নীতির উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
সাংবাদিকের ফোনালাপে মাদ্রাসার সভাপতির বক্তব্য,মাদ্রাসার সভাপতিকে মুঠোফোনে জিজ্ঞাসা করলে সভাপতি বলেন,
”টাকা-পয়সার লেনদেন বা হিসাবের তদারকি আমি নিজে সরাসরি করি না। তবে নির্মাণ খাতের খরচের রশিদ ও মেমো সবই থাকার কথা। আমরা যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন প্রতি মাসে মাসে আয়-ব্যয় এবং দেনা-পাওনার হিসাব করা হতো। জঞ্জাল বা ঝামেলা তৈরি হওয়ার পর থেকে আমি নিজে ব্যবসাগত কাজে ব্যস্ত থাকায় মাদ্রাসায় আসা- যাওয়া কম হয়েছে। তবে কোনো খাতে এককালীন ৭০-৮০ হাজার টাকা খরচ হয়ে থাকলে তা হয়তো কমিটির মিটিংয়ে অনুমোদন বা পাস করিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। ব্যাংকের টাকা উত্তোলনের বিষয়ে আমাকে জানানো হলে আমি সায় দিতাম। সম্পূর্ণ কাগজপত্র ও মেমো পর্যালোচনা না করে অগোছালো মন্তব্য করা যাবে না। আমি এসে নথিপত্র দেখে বিস্তারিত বলতে পারব।
আইনানুগ ব্যবস্থার দাবি:মাদ্রাসার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকবৃন্দ, কর্মকর্তা ও স্থানীয়রা এই ফান্ডের নিরপেক্ষ অডিট দাবি করেছেন। কোনো ধরনের অসচ্ছতা বা দুর্নীতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধারসহ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়েছে।







