
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এক ব্যবসায়ীর কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে না পেয়ে ফিল্মি স্টাইলে বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা এবং ভাঙচুর চালিয়েছে স্থানীয় কুখ্যাত কিশোর গ্যাং ও মাদক সম্রাট ‘চশমা সাব্বির’ বাহিনী। হামলাকারীরা তিনজনকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে রক্তাক্ত জখম করেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাদের লক্ষ্য করে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরো এলাকায় যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।
পরবর্তীতে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত ফোর্স গভীর রাতে ওই এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মাদক সম্রাট সাব্বিরের আস্তানা থেকে প্রায় ২ হাজার পিস ইয়াবা ও বিপুল পরিমাণ হেরোইনসহ সাব্বিরের স্ত্রী অন্তরা খাতুন এবং তার বাহিনীর আরও ২ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।
শনিবার (২৩ মে) দিবাগত রাত ১টার দিকে ফতুল্লা থানাধীন মাসদাইর গুদারাঘাট হাজির মাঠ এলাকায় এই রোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনা ঘটে। হামলায় গুরুতর আহতরা হলেন—মিজান, কুদরত ও আর এস কম্পোজিট গার্মেন্টসের গাড়িচালক জনি। তাঁদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাসদাইরের হাজির মাঠ ও হুমায়ুন রোড এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারী চক্রের মূলহোতা ‘চশমা সাব্বির’ এবং তার বাহিনীর সদস্যরা বেশ কিছুদিন ধরে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল। ওই ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সাব্বির চরম ক্ষিপ্ত হয়। এরই জেরে শনিবার গভীর রাতে সাব্বিরের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি সন্ত্রাসী দল চাপাতি, চাইনিজ কুড়াল ও আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ওই ব্যবসায়ীর বাড়িতে আকস্মিক হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ সময় সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মিজান, কুদরত ও জনিকে রক্তাক্ত জখম করে।
স্থানীয়রা জানায়, খবর পেয়ে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পুলিশ দেখে সাব্বির বাহিনী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং গ্রেফতার এড়াতে পুলিশকে লক্ষ্য করে পরপর বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। বিকট শব্দে ককটেল ফুটলে পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই সুযোগে মূলহোতা সাব্বির ও তার সশস্ত্র ক্যাডারেরা অন্ধকারের মধ্যে গলি দিয়ে পালিয়ে যায়।
ককটেল হামলার খবর পেয়ে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে গিয়ে পুরো হাজির মাঠ এলাকা কর্ডন বা অবরুদ্ধ করে ফেলে। পরে পুলিশ মাদক সম্রাট সাব্বিরের গোপন আস্তানায় ও বাসায় চিরুনি অভিযান চালায়। অভিযানে সাব্বিরের ঘর তল্লাশি করে প্রায় ২ হাজার পিস নিষিদ্ধ ইয়াবা ট্যাবলেট ও বিপুল পরিমাণ হেরোইন উদ্ধার করা হয়।
মাদক ও ককটেল মজুদের অপরাধে ঘটনাস্থল থেকেই সাব্বিরের স্ত্রী অন্তরা খাতুন (২৫) কে হাতেনাতে গ্রেফতার করে পুলিশ।
সন্ত্রাসী হামলা ও পুলিশের ওপর ককটেল বিস্ফোরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন ও অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানান, “সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির হামলার খবর পেয়ে ফতুল্লা থানা পুলিশ চিহ্নিত মাদক কারবারি সাব্বির ও তার বাহিনীর সদস্যদের গ্রেফতার করতে অভিযান চালায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে অপরাধীরা ককটেল ফুটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে পালিয়ে যায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স নিয়ে সাব্বিরের বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও হেরোইনসহ সাব্বিরের স্ত্রী অন্তরা খাতুনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পলাতক মূলহোতা সাব্বিরসহ বাকিদের গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। এই ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলা, মাদক এবং চাঁদাবাজির পৃথক ধারায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
এদিকে, রক্তাক্ত জখম হওয়া আর এস নীট কম্পোজিটের গাড়ি চালক জনি কাপা কাপা সুরে এই পৈশাচিক হামলার লোমহর্ষক বিবরণ দেন। তিনি বলেন, “আমি ঢাকা থেকে আমাদের কোম্পানির এক স্যারকে নিয়ে মাসদাইরে ওনার বাড়িতে নামিয়ে দিই। স্যার গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতর ঢোকার পরপরই হঠাৎ ১০-১২ জন সন্ত্রাসী চাপাতি, চাইনিজ কুড়াল ও পিস্তল নিয়ে আমার গাড়িটি ঘিরে ফেলে। তারা অত্যন্ত উগ্রভাবে চিৎকার করে বলে—‘এটা হানিফ সাহেবের গাড়ি না?’ আমি বারবার বলি—না ভাই, এটা আর এস নীট কম্পোজিটের গাড়ি। তারা আমার কথা বিশ্বাস না করে গাড়ির সিট ও ব্যাকডালা তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে। কিছু না পেয়ে তারা আমার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। আমি বলি, ভাই আমি ড্রাইভার মানুষ, এত টাকা পামু কই? জীবন বাঁচাতে পকেট থেকে ৫০০ টাকা বের করে দিলেও তারা আমার মোবাইল ও বাকি টাকা ছিনিয়ে নিয়ে আরও টাকার জন্য চড়াও হয়।”
জনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরও বলেন, “একপর্যায়ে আমি বুদ্ধি করে বলি, ঠিক আছে আমি ওপরে স্যারের কাছ থেকে টাকা এনে দিচ্ছি। এরপর স্যার নিচে এসে মেইন গেট খুললে আমি ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করি। ঠিক তখনই সাব্বিরের সন্ত্রাসীরা আমার মুখ লক্ষ্য করে সজোরে চাপাতির কোপ দেয়। কোপটি আমার চোখ ও নাকের নিচে প্রায় ২ ইঞ্চি পর্যন্ত দেবে গিয়ে কেটে যায়। এরপর শরীরেও আরেকটি কোপ দেয়।







