
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে বহু বছর ধরে। জ্বালানি নিরাপত্তা, গ্যাসের সীমিত মজুদ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর যুক্তিতে নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত এখনও বহাল রয়েছে। কিন্তু গোটা নারায়ণগঞ্জের বিশেষ করে ফতুল্লা থানা এলাকার বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প বলছে।
ফতুল্লার বিভিন্ন ইউনিয়নে গত কয়েক বছরে নির্মিত অসংখ্য নতুন ভবনে প্রতিদিন জ্বলছে গ্যাসের চুলা। অথচ সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এসব ভবনের বৈধভাবে নতুন গ্যাস সংযোগ পাওয়ার কথা নয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে সংযোগ বন্ধ থাকার পরও নতুন ভবনগুলোতে গ্যাস পৌঁছালো কীভাবে?
স্থানীয় বাসিন্দা, ভবন মালিক এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বক্তাবলী ইউনিয়ন ছাড়া ফতুল্লা থানার অধিকাংশ এলাকায় নতুন নির্মিত বাড়িগুলোর বড় অংশেই গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণের পর নির্দিষ্ট দালাল চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মী এবং দালালদের সমন্বয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি অবৈধ নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, একের পর এক নতুন বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। এসব ভবনের অনেকগুলোতেই গ্যাসের চুলা ব্যবহার হচ্ছে। অথচ নতুন সংযোগ বন্ধ থাকার কারণে এসব ভবনের অধিকাংশেরই বৈধ সংযোগ পাওয়ার সুযোগ ছিল না। স্থানীয়দের ভাষ্য, অবৈধ সংযোগ এখন অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’-এ পরিণত হয়েছে। সবাই বিষয়টি জানলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নতুন সংযোগ বন্ধ থাকার পরও যদি বিপুল সংখ্যক নতুন গ্রাহক গ্যাস ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে। কারণ গ্যাস সংযোগ একটি অবকাঠামোগত বিষয়; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতে বৃহৎ পরিসরে এমন সংযোগ স্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে রাষ্ট্র। আবাসিক গ্যাস ব্যবহারের বিপরীতে সরকার নির্ধারিত বিল ও বিভিন্ন চার্জ আদায় করে থাকে। কিন্তু অবৈধ সংযোগের ক্ষেত্রে সেই রাজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না হয়ে চলে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজদের পকেটে এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে সরকার একদিকে গ্যাস সরবরাহ করছে, অন্যদিকে সেই গ্যাসের বিপরীতে প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, হাজার হাজার অবৈধ সংযোগের বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে বিল আদায় না হওয়া মানে কোটি কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারানো। একইসঙ্গে অবৈধ সংযোগের কারণে বৈধ গ্রাহকদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায়, রান্নার সময় ভোগান্তি বাড়ে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়।
শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, অবৈধ গ্যাস সংযোগ জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। অনুমোদনহীন পাইপলাইন, নিম্নমানের সংযোগ এবং প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে গ্যাস লিকেজ, বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেড়ে যায়। দেশে অতীতে ঘটে যাওয়া একাধিক গ্যাস দুর্ঘটনার পেছনেও অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ সংযোগের বিষয়টি উঠে এসেছে।
তবে এই সমস্যার আরেকটি সামাজিক বাস্তবতাও রয়েছে। নতুন বাড়ি নির্মাণকারী অনেক মালিকের দাবি, সরকার নতুন সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর তাদের সামনে কার্যত কোনো বিকল্প রাখা হয়নি। নগর এলাকায় রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেকেই অবৈধ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের প্রশ্ন যখন বাস্তবে হাজার হাজার পরিবার গ্যাস ব্যবহার করছে, তখন সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে?
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের একটি বড় অংশ বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে অবৈধ সংযোগগুলোকে বৈধতার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নির্দিষ্ট জরিমানা, সংযোগ ফি এবং যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এসব সংযোগ নিয়মিত করা হলে একদিকে দুর্নীতি কমবে, অন্যদিকে সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পাবে। পাশাপাশি গ্রাহকরাও বৈধ সেবার আওতায় এসে নিয়মিত বিল পরিশোধ করবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রথমেই ফতুল্লা এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ পরিচালনা করা প্রয়োজন। কতগুলো ভবনে বৈধ সংযোগ রয়েছে, কতগুলো অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করছে এবং এসব সংযোগের সঙ্গে কারা জড়িত—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। একইসঙ্গে দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি বা চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ফতুল্লার বর্তমান বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও যদি হাজার হাজার নতুন ভবনে গ্যাস পৌঁছে যায়, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার পেছনে কারা কাজ করছে? আর রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবহার করেও যদি সরকার রাজস্ব না পায়, তাহলে তার দায় কে নেবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা এখন শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সুশাসন এবং জ্বালানি খাতের স্বচ্ছতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় ইস্যু।







