আলাদীনের চেরাগ পেয়ে সাবেক মেম্বার জাকিরের অঢেল সম্পদ

282
আলাদীনের চেরাগ পেয়ে সাবেক মেম্বার জাকারিয়া জাকিরের অঢেল সম্পদ
আলাদীনের চেরাগ পেয়ে সাবেক মেম্বার জাকারিয়া জাকিরের অঢেল সম্পদ

অনুসন্ধানী বিভাগ, নারায়ণগঞ্জ সমাচার:

৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই ভাগ্যের চাকা খুলে যেতে থাকে ফতুল্লার মাসদাইর এলাকার জাকারিয়া জাকির ওরফে জাকির মেম্বারের। বাড়ৈভোগ এলাকায় থাকা বিভিন্ন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ওয়েস্টেজ দখলের অন্যতম ছিল সে। দলের নেতাকর্মীদের ভাগ করে দেয়ার নাম করে ওয়েস্টেজ বিক্রির টাকার অর্ধেক যেতো তার পকেটে। আর ১০ জনের টাকা নিজের করে নিয়ে পরবর্তীতে সে অঢেল সম্পদের মালিক হয়।

স্থানীয়রা জানায়, জাকির মেম্বারের ৭ তলা ভবন রয়েছে অন্তত চারটি, কোনটা দুই ইউনিটের কোনটা চার ইউনিটের। আছে কয়েকটি চারতলা ভবন, এরমধ্যে একটি চারতলা ভবনে রয়েছে ৮৮ টি রুম। এছাড়া মার্কেট, ব্যাংকে নামে-বেনামে নগদ টাকা এমনকি স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কারেরও অভাব নেই। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলার আসামি হলেও চলাচল তার প্রকাশ্যেই। পাশের গ্রাম ভোলাইল গেউদ্দার বাজার এলাকায় ৩৩ শতাংশ জায়গা এখনও প্লট করে বিক্রি করছে সে।

জানা গেছে, ২০২১ সালের ১০ জানুয়ারি ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হয় ৭১ সদস্যের। যার সভাপতি ছিল শামীম ওসমানের আশীর্বাদপুষ্ট এম সাইফউল্লাহ বাদল (প্রয়াত), সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী। এ কমিটিতে কোষাধ্যক্ষ পদ পায় জাকির মেম্বার। এ পদ নিতে বাদল-শওকতকে ম্যানেজ করতে মোটা অংকের টাকা দিতে হয়েছে তাকে।

স্থানীয়রা জানান, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও তখন টাওয়ার সেলিমের কারণে অর্থনৈতিকভাবে তেমন সুবিধা করতে পারেনি জাকির। পরে ২০০৮ সালে পুনরায় আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর বিগত ১৭ বছর একটানা তার দল ক্ষমতায় থাকায় শামীম ওসমানের অনুগত হয়ে টাকা কামানোর চেরাগ পেয়ে যায় সে। এলাকায় জাকিরকে অনেকে ‘কিপ্টে জাকির’ বলেও অভিহিত করে। অন্যসব নেতার তুলনায় জাকির হিসেবি হওয়ায় তার এ উপাধি জুটেছে। জাকিরের হাতে নেতাকর্মীদের টাকা গেলে সেই টাকা পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়তো। আস্ত টাকার বান্ডিল থেকে কাউকে টাকা দিতো না সে। টাকা নিয়ে নিজের বাড়িতে উঠে যেতো আর যারা টাকা পাওনা তাদের কে বলতো, “পরে নিস।” এই ‘পরে’ যে কবে তা বুঝতো না অনেকেই। এরমধ্যে যারা বারবার তাগাদা দিতো তারা টাকা পেতো আর যারা তাগাদা না দিতো তারা টাকা পেতো না। তালিকায় নাম থাকলেও যাকে খুশি তাকে ভাগ দিতো জাকির।

জানা গেছে, সে সময়ে তার ছোট ভাই বিএনপি নেতা বাবলুকে ওয়েস্টেজের টাকা দিতো সে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড়ৈভোগ এলাকায় মিনার গ্রুপ, ফারিয়া নিটেক্স, ফারিয়া ফ্যাশন, অকটিমা, একটি স্পিনিং মিলসহ বিভিন্ন কারখানার ওয়েস্টেজ ছিল জাকির গ্রুপের দখলে। এছাড়া এলাকায় অবৈধ পরিবহন ব্যবসার সাথেও জড়িত সে। বাড়ৈভোগ থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাত্রীবাহী বাস ছেড়ে যায়। এসব বাসের কারণে এলাকায় নিত্য জ্যাম থাকলেও তখন জাকির গ্রুপের কারণে কেউ কিছু বলতো না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এলাকার ফালুনির বাড়ির সামনে ৪ শতাংশ জায়গার উপর ২ ইউনিটের ৪ তলা ভবন রয়েছে জাকির মেম্বারের। দবিরের বাড়ির সামনে রয়েছে একটি ৭ তলা ভবন, মার্কেট এবং রিকশার গ্যারেজ। বাড়ৈভোগ বটতলা এলাকায় ৮ শতাংশ জায়গার মধ্যে ৪ ইউনিটের ৭ তলা বাড়ি রয়েছে। বাড়ৈভোগ মিনার গার্মেন্টসের সামনে ১২ শতাংশ জায়গায় ৪ তলা ভবন রয়েছে। শুধু এই ভবনেই ৮৮ টা ফ্ল্যাট রয়েছে তার। প্রতি কক্ষ ৫ হাজার ৫০০ টাকা করে মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হয় শুধু এই এক বাড়ি থেকেই। একই এলাকায় ৫ শতাংশ জায়গায় একটি ৭ তলা ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করলেও ৫ আগস্টের পর তা বন্ধ রয়েছে। এছাড়া তার পৈতৃক জায়গায় নিজের টাকায় ৪ ইউনিটের একটি ৭ তলা বাড়ি রয়েছে জাকির মেম্বারের। ভোলাইল গেউদ্দার বাজার এলাকায় একটি প্লট বিক্রির প্রকল্প চলমান রয়েছে। এইসব বাড়ি, মার্কেট, গ্যারেজ ভাড়া উঠানোর জন্য জাকিরের দুইজন ম্যানেজার রয়েছে বলে জানা গেছে। মাসে মোটা অংকের ভাড়া ছাড়াও ব্যাংকে নামে-বেনামে বহু টাকা রয়েছে তার।

৫ আগস্টের পর জাকির মেম্বারের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হলেও বিএনপির পদহীন এক নেতাসহ আরও কয়েকজন নেতাকে ম্যানেজ করে এখনও ওপেন চলাচল করে সে। এমনকি জায়গা-জমির ব্যবসা-দালালীও করছে দেদারছে।

এ বিষয়ে জাকির মেম্বারের সাথে কথা হলে তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেন, “আমি ঐ সকল ফ্যাক্টরির ঝুটের টাকা এলাকার মানুষের মাঝে সুষম বণ্টন করতাম, এটা তো তাদের হক। বাইরের কারও তো হক নেই। তাই বাইরের কেউ যাতে ভাগ না বসায় সেটা আমি দেখতাম”

অবৈধ পরিবহন ব্যবসার নিয়ন্ত্রক হওয়ার বিষয়েও তিনি বলেন, “ঐ একইভাবে যেহেতু আমি মেম্বার ছিলাম তাই সকলের মাঝে বণ্টন করে দিতাম।”

নেতাকর্মীদের অনেকের টাকা মেরে দেয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি কখনো কারো টাকা মেরে খাই নি। বণ্টন করতে গিয়ে কিছু হয়তো এদিক, সেদিক হতে পারে।” সেই টাকা বিশেষ পেশার মানুষদের সহ অন্যদের দিতেন বলেও জানান তিনি।

তার স্ত্রীর নামে শত ভরিরও বেশি স্বর্ণ রয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “নারীদের শখই তো স্বর্ণ কেনা। ঈদে কেনাকাটা না করে সেই টাকা জমিয়ে স্বর্ণ কিনতো আমার স্ত্রী। আমার তিনটি মেয়ে, তাদের জন্য স্বর্ণ কিনতো। তবে কোনোভাবেই তা শত ভরি হবে না। ১০/১২ ভরি হতে পারে।”

এতো সম্পদ ও সম্পত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এতো কিছু কই। কয়েকটা বাড়ি, এটা কি খুব বেশি হলো? আরও কত মানুষ কত কিছু করেছে।”

একজন মেম্বার হয়ে কোন আলাদীনের চেরাগ পেয়ে এতো এতো বহুতল ভবন, মার্কেট, গ্যারেজ, জমি-জমা করলেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি প্রথমে বলেন, “আমি যে ভবনে থাকি সেটা আমার পৈতৃক সম্পত্তি।” বাকিগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, “বটতলায়ও আমার পৈতৃক সম্পদ আছে।” এছাড়া, তিনি অনেক আগে থেকেই জমির ব্যবসা করেন, সেই জমির ব্যবসার টাকা দিয়ে এই অর্থ সম্পত্তি করেছেন বলে দাবি করেন।

গরিবদের সম্পত্তি দখল করে বা প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন বড় বড় গ্রুপকে কম মূল্যে কিনে দিয়ে নিজে দালালি খাওয়া বা লাভবান হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি কখনো কাউকে ঠকাই নি। বড় বড় গ্রুপগুলো জমি কিনতে চাইলে যারা বিক্রি করতে চাইতো, তাদের আমি বেশি টাকা নিয়ে দিতাম।”