
এক সময় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তাদের নাম উচ্চারণ করা মানেই ছিল ক্ষমতা, প্রভাব ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। বিএনপির রাজনীতিতে তারা ছিলেন জেলার সবচেয়ে শক্তিশালী পাঁচ মুখ। চারজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন দলটির মনোনয়নে, তিনজন জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, একজন হয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। দীর্ঘ সময় তারা জেলার রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
কিন্তু রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা তাদের কারও জন্যই অনুকূল থাকেনি। দলীয় শৃঙ্খলা থেকে বিচ্যুতি, রাজনৈতিক অবস্থান বদল, দুঃসময়ে নিষ্ক্রিয়তা, বিদ্রোহী অবস্থান, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং সাংগঠনিক বিচ্ছিন্নতার ধারাবাহিকতায় আজ তারা কার্যত বিএনপির মূলধারার রাজনীতি থেকে হারিয়ে গেছেন। এক সময় যারা মনোনয়ন দিতেন, প্রার্থী ঠিক করতেন কিংবা জেলার রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতেন, তারাই এখন রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে অবস্থান করছেন।
এই তালিকার প্রথম নাম অধ্যাপক রেজাউল করিম। সোনারগাঁ আসন থেকে টানা তিনবার বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি জেলার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। পরে জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হন। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এই উজ্জ্বল অধ্যায়ের পরই শুরু হয় তার পতনের গল্প।
১/১১-এর রাজনৈতিক সংকটে তিনি দলের তৎকালীন সংস্কারপন্থী অংশের সঙ্গে অবস্থান নেন এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে তার সক্রিয় উপস্থিতি কার্যত দেখা যায়নি। সর্বশেষ দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির সঙ্গে তার সম্পর্কের শেষ সেতুটিও ভেঙে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে দলীয় অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তই তার রাজনৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
একই ধরনের পরিণতি হয়েছে অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের। দীর্ঘদিন জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিএনপি সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে বিএনপি ছেড়ে তৃণমূল বিএনপির হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় মোড় তৈরি করে। রূপগঞ্জে অত্যন্ত কম ভোট পাওয়ার পর থেকেই কার্যত তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ভেঙে পড়ে। এক সময় যিনি বিএনপির অন্যতম মুখ ছিলেন, তিনি আজ মূলধারার রাজনীতির প্রান্তিক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের রাজনৈতিক জীবনও উত্থান-পতনের ব্যতিক্রমী উদাহরণ। আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনের মাত্র ১৭ দিন আগে প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি ছিল আলোচিত। পরে জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পান। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পর বিভিন্ন বিতর্কের জেরে সভাপতির পদ হারান। এরপর দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে দুটি আসনে নির্বাচনে অংশ নিলেও কোথাও বিজয়ী হতে পারেননি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার এই পদক্ষেপ তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
মোহাম্মদ আলীর ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার একই চিত্র দেখা যায়। বিএনপির সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তী সময়ে তিনি দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান। দীর্ঘদিন ধরেই তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ এবং বিশেষ করে ওসমান পরিবারের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার অভিযোগ ছিল। সর্বশেষ একটি অখ্যাত রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক অধ্যায়েরও কার্যত সমাপ্তি ঘটে।
আড়াইহাজারের তিনবারের সাবেক বিএনপি সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুরও সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া আরেক প্রভাবশালী নেতা। বিএনপির সবচেয়ে কঠিন সময়ের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে তার দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল না বলে দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ। সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাওয়ার ফলে নতুন নেতৃত্বের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তার রাজনৈতিক প্রভাবও বিলীন হয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিএনপির এই পাঁচ নেতার পতন একই সূত্রে গাঁথা। তাদের প্রত্যেকেই এক সময় দলীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি। কেউ দলীয় সংকটের সময়ে মাঠে ছিলেন না, কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, কেউ ভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে গেছেন, আবার কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নিজ দলের বিরুদ্ধেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ফলে দলীয় আস্থার জায়গা হারানোর পাশাপাশি জনসমর্থনের ভিত্তিও ক্রমশ ক্ষয়ে গেছে।
রাজনীতিতে একটি প্রচলিত সত্য হলো, জনসমর্থন অর্জন যত কঠিন, তা ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন। নারায়ণগঞ্জের এই পাঁচ নেতার রাজনৈতিক জীবন সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। এক সময় যাদের নাম ছাড়া জেলার বিএনপির রাজনীতি কল্পনা করা যেত না, আজ তারা কার্যত রাজনৈতিক প্রান্তিকতায় অবস্থান করছেন।
জেলার রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে, বর্তমান প্রজন্মের নেতৃত্ব, বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং এই নেতাদের বয়স ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় তাদের মূলধারার রাজনীতিতে আগের অবস্থানে ফিরে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের উত্থান যেমন অবশ্যম্ভাবী, তেমনি ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কখনও কখনও কয়েক দশকের অর্জনকেও মুহূর্তে ম্লান করে দিতে পারে। নারায়ণগঞ্জের এই পাঁচ নেতার রাজনৈতিক পরিণতি সেই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।







