
নারায়ণগঞ্জ শহরের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ফুটপাত দখল ও হকার সমস্যাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এই ইস্যু এখন আর শুধু একটি নাগরিক সমস্যা নয়, বরং সরাসরি রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এখন এমন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরে রাখছে পুরো শহরবাসী।
নগরবাসীর মধ্যে ব্যাপকভাবে একটি বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, এই দুই নেতা যদি সত্যিকার অর্থে আন্তরিক ও দৃঢ় অবস্থানে থাকেন, তাহলে কোনোভাবেই ফুটপাত দখল করে হকার বসতে পারবে না। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনার শিকার সাধারণ মানুষ এখন আর কোনো অজুহাত শুনতে রাজি নয়। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে হাঁটার জায়গা নেই, যানজট নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে, আর এই সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হকারদের দখলদারিত্ব।
অনেকেই মনে করছেন, হকার ইস্যুটি শুধু জীবিকার প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এর আড়ালে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা বছরের পর বছর ধরে এই বিশৃঙ্খলাকে টিকিয়ে রেখেছে। অতীতে এই সিন্ডিকেটকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালন-পালন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক এমপি শামীম ওসমান-এর সময়কালে এই সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং তা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে বলে দাবি করেন স্থানীয়দের একটি বড় অংশ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রভাব বিস্তারই তখন অগ্রাধিকার পেয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় হকারদের সংগঠিত করে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয়, যারা শহরের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির এক ধরনের অঘোষিত শাসন কায়েম করেছিল। এতে করে সাধারণ মানুষ যেমন ভোগান্তির শিকার হয়েছে, তেমনি ব্যবসায়ী ও পথচারীদের জন্য শহরটি হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতেও পড়েছে প্রতিনিয়ত।
এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর শাসনামলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি এমন অভিযোগও উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। অনেকের মতে, রাজনৈতিক সমর্থন ও প্রভাবের কারণে এসব অবৈধ কার্যক্রম বছরের পর বছর চলতে পেরেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে করা হচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পরিচ্ছন্ন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ শহর গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন—এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। এই অবস্থায় প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানকে দায়িত্ব দেওয়ার পেছনেও কঠোর বার্তা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফলে এই দায়িত্ব এখন শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
শহরবাসীর প্রত্যাশা এখন পরিষ্কার ও সরাসরি। তারা আর কোনো অজুহাত বা দীর্ঘসূত্রিতা দেখতে চান না। অবিলম্বে সমন্বিত অভিযান চালিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করার দাবি উঠেছে জোরালোভাবে। অনেকেই বলছেন, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না, পুনরায় দখল ঠেকাতে স্থায়ী নজরদারি ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার সমাধানে অর্ধেক ব্যবস্থা কোনো কাজে আসবে না। যদি কঠোর আইন প্রয়োগ না করা হয়, তাহলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পুরনো চিত্র ফিরে আসবে। অতীতেও একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী হয়নি, কারণ পরবর্তীতে কোনো কার্যকর মনিটরিং ছিল না এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে ব্যবস্থা শিথিল হয়ে পড়েছিল।
এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই অবৈধ কাঠামো ভাঙতে গেলে শক্ত অবস্থান নিতে হবে, যা অনেক ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তবুও নগরবাসীর একটি বড় অংশ মনে করে, এই ঝুঁকি নিতেই হবে, অন্যথায় শহরকে আর কোনোভাবেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। হকার ইস্যু সমাধান করতে পারলে তা হবে একটি বড় সফলতা, আর ব্যর্থ হলে সেটি পরিণত হতে পারে রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতীকে। এমপি আবুল কালাম ও প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানের জন্য এটি এখন শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার লড়াই হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এখন পুরো শহর তাকিয়ে আছে এই দুই নেতা কি সত্যিই দৃঢ় অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি বদলাতে পারবেন, নাকি আগের মতোই আবারও ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।







