
নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়ার মতো ব্যস্ত এলাকায় হঠাৎ করেই মুখ ঢেকে লাঠিসোঁটা হাতে যুবলীগের ঝটিকা মিছিল ঘিরে পুরো জেলায় রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা অবস্থানে থাকলেও ভেতরে ভেতরে আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) চাষাঢ়া এলাকায় লাল কাপড়ে মুখ ঢেকে লাঠিসোঁটা হাতে অর্ধশতাধিক যুবলীগ নেতাকর্মীকে মিছিল করতে দেখা যায়। পরে সেই ভিডিও আওয়ামী যুবলীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিছিলকারীরা “জয় বাংলা” ও শেখ হাসিনা স্লোগান দিতে দিতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলাকা ত্যাগ করে। এতে পথচারীদের মাঝে আতঙ্ক ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়।
চাষাঢ়া নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোর একটি। এমন স্পর্শকাতর এলাকায় প্রকাশ্যে এই ধরনের মিছিল স্থানীয় বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মাঝেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন শোডাউন নয়; বরং মাঠে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার একটি সাংগঠনিক বার্তা।
বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির একাংশের ছত্রছায়ায় অবস্থান নিয়ে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে মিছিলের ঘটনার পর প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছে। শুক্রবার চাষাঢ়ার গ্র্যান্ড হল রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের গোপন বৈঠক থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলের ঘটনার পর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী গণমাধ্যমকে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বৈঠক চলাকালে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখন ঝটিকা মিছিল, মশাল মিছিল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে গভীর রাত কিংবা ব্যস্ত সড়কে আকস্মিক মিছিল করে ভিডিও ভাইরাল করাকে নতুন কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগেও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ঝটিকা মিছিল এবং গোপন বৈঠকের অভিযোগে একাধিকবার আটক ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। ফতুল্লা, কাশিপুর ও রূপগঞ্জে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নাশকতার প্রস্তুতির অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একপক্ষ বলছে, এটি নিষিদ্ধ রাজনীতির পুনরুত্থানের আলামত; অন্যপক্ষ এটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে অতিরঞ্জিত প্রচারণা বলে দাবি করছে।
তবে সাধারণ নাগরিকদের প্রশ্ন একটাই নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরীতে যদি আবারও সংঘাতমুখী রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে? সেই প্রশ্ন এখন প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।







