ফতুল্লায় বৃদ্ধার জমি দখল চেষ্টার অভিযোগ ব্যবসায়ী দিলীপ রায়ের বিরুদ্ধে

284
ফতুল্লায় বৃদ্ধার জমি দখল চেষ্টার অভিযোগ দিলীপ রায়ের বিরুদ্ধে
ফতুল্লায় বৃদ্ধার জমি দখল চেষ্টার অভিযোগ দিলীপ রায়ের বিরুদ্ধে

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ভোগদখলে থাকা জমি জবরদখলের চেষ্টা, বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে ঘর ভাঙচুর এবং নারীদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে দিলীপ রায় নামে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ভুক্তভোগী পরিবারটি। জানমালের নিরাপত্তা ও আইনি প্রতিকার চেয়ে গত ২৭ জুন ফতুল্লা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন ভুক্তভোগী নারী কুলসুম বেগম, যার নম্বর ২৩৫১।

জিডিতে পূর্ব ইসদাইর এলাকার বাসিন্দা কুলসুম বেগম তাঁর প্রতিবেশী দিলীপ রায়কে প্রধান অভিযুক্ত বা ১ নম্বর বিবাদী করেছেন। এছাড়া ইব্রাহিম হোসেন বিশালসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২/৩ জনকে এতে বিবাদী করা হয়েছে।

জিডির সূত্র অনুযায়ী, ফতুল্লা মৌজাস্থ সি.এস ও এস.এ-৯৩৪, আর.এস-১২৭৬ দাগের ৫.৫০ শতাংশ সম্পত্তি ক্রয় সূত্রে মালিক হয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে সেখানে সেমিপাকা টিনের ঘর নির্মাণ করে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন কুলসুম বেগম ও তাঁর স্বামী। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের এই ক্রয়কৃত সম্পত্তি ও বসতভিটার ওপর নজর পড়ে প্রতিবেশী দিলীপ রায়ের। তিনি স্থানীয় প্রভাব ও পেশিশক্তি খাটিয়ে জমির একটি অংশ নিজের দাবি করে পরিবারটিকে উচ্ছেদের পাঁয়তারা করে আসছিলেন।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জুন বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে প্রধান অভিযুক্ত দিলীপ রায় তাঁর সহযোগীদের নিয়ে ১০/১২ জন অজ্ঞাতনামা লোক এবং দেশীয় অস্ত্রসহ কুলসুম বেগমের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করেন। ওই সময় বাড়িতে কোনো পুরুষ লোক না থাকার সুযোগে তারা বসতঘরের সেমিপাকা অংশ ও টিনের চাল ভাঙচুর করার চেষ্টা চালান।

এ সময় কুলসুম বেগম ও তাঁর পুত্রবধূ নাসরিন আক্তার জীবন বাজি রেখে নিজেদের ঘর রক্ষায় বাধা দিলে দিলীপ রায় ও তাঁর লোকজন তাঁদের ওপর চড়াও হন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ লাঞ্ছিত করেন। একপর্যায়ে কুলসুম বেগমকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় এবং তাঁর বড় ছেলেকে ফোনে হত্যার পর লাশ গুমের হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উপায় না দেখে ভুক্তভোগী পরিবারটি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করলে ফতুল্লা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

জিডিতে কুলসুম বেগম আরও উল্লেখ করেন, পুলিশ আসার পর প্রথম দফায় দিলীপ রায় ও তাঁর লোকজন পিছু হটলেও তারা আইনের প্রতি কোনো তোয়াক্কা করেননি। এর মাত্র কয়েকদিন পর, গত ২৭ জুন সকালে তারা পুনরায় দলবল নিয়ে ওই জমি জবরদখলের উদ্দেশ্যে হানা দেন। পুনরায় বাধা দিতে গেলে পুরো পরিবারটিকে এলাকা ছাড়া করার ভয়ভীতি দেখানো হয়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান অভিযুক্ত দিলীপ রায় বলেন, “ফতুল্লা থানার এসআই নন্দন স্যার ও তদন্ত ওসি স্যার বলছেন আপনার জায়গা আপনে বুঝে নেন। তাই আমার জায়গা আমি বুঝে নিয়েছি। আমি ২০০৪ সালে ৭ শতাংশ জমি ক্রয় করি। পরে ২০২২ সালে কুলসুম বেগম গং আমার কাছে আরও ২ শতাংশ জমি বিক্রয় করে, কিন্তু জমির দখল এখনো বুঝিয়ে দেয়নি। জমি বুঝে নিতে গেলে তারা ৭ শতাংশসহ পুরো জমি মাপতে বলে। পুরো জমি না মাপলে তারা ২ শতাংশ বুঝিয়ে দিবে না বলে জানায়। পরে আমার এলাকার এক ছোট ভাই আছে বিশাল; সে বলে—আমি দেখি আলোচনা করে, না পারলে আমি আপনাকে সঠিকভাবে করে দিচ্ছি। পরে তাদের সাথে ঝগড়া লেগে গেলে থানায় গিয়ে বৈঠক হয়, কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।”

এদিকে ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা এবং নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী ইব্রাহিম হোসেন বিশাল বলেন, “আমার জায়গা যদি আমি পাই, আমি বুঝে নিবো না?” আপনি নিজে এই জমির মালিক কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, আমি মালিক না। আমার ভাই মালিক।” তিনি ভাই বলতে কাকে বোঝাচ্ছেন জানতে চাইলে বলেন, “দিলীপ রায় জমির মালিক।” প্রতিবেদক তাঁর কাছে জানতে চান, ‘আপনি তো মুসলমান, আর দিলীপ রায় সনাতন ধর্মাবলম্বী; তাহলে তিনি আপনার ভাই কীভাবে হলেন?’ জবাবে বিশাল বলেন, “তিনি আমার পরিচিত বা নিকটাত্মীয়। তাই তিনি আমাকে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে সহযোগীতা করতে।

বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগের উত্তরে বিশাল দাবি করেন, “আমার জায়গায় আমার ঘর ছিল, সেটা আমি সরিয়েছি; এটা ভাঙচুর কেন হবে?” পরিশেষে তিনি এই প্রতিবেদককে হুমকি দিয়ে বলেন, “নিউজ করেন ভালো কথা, যেটা সত্য সেটা লিখবেন। যদি আনলিগ্যাল (বেআইনি) কিছু করেন, তাহলে আপনার বিরুদ্ধে মামলা করব।”

বর্তমানে দিলীপ রায় ও বিশালের ক্রমাগত হুমকি ও পেশিশক্তির দাপটে নিজেদের বসতভিটা রক্ষা এবং জানমালের চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন কুলসুম বেগম ও তাঁর সন্তানরা। যেকোনো সময় পুনরায় বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় পুলিশ প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুব আলম জানান, “আমরা আদালতের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা পেয়েছি। আদালতের আদেশ অনুযায়ী আজ সকালে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রেহানুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষকে নোটিশ জারি করে এসেছেন।”

ওসি আরও বলেন, “আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী নির্ধারিত তারিখের পূর্ব পর্যন্ত ওই বিরোধপূর্ণ জমিতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে কেউ কোনো ধরনের কাজ বা নির্মাণকাজ করতে পারবেন না। একই সঙ্গে এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ তৎপর রয়েছে এবং কেউ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”