আবারো ফতুল্লাকে উন্নয়ন বঞ্চিত করার গভীর ষড়যন্ত্র

80
নাসিকের সীমানা সম্প্রসারণে আংশিক প্রস্তাব: ফতুল্লাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ
নাসিকের সীমানা সম্প্রসারণে আংশিক প্রস্তাব: ফতুল্লাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সীমানা সম্প্রসারণ নিয়ে জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত প্রস্তাবিত গণবিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফতুল্লা থানার চারটি ইউনিয়নের মধ্যে কোথাও পুরো ইউনিয়ন, আবার কোথাও একটি ওয়ার্ড কিংবা একটি ওয়ার্ডের অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবকে ‘বৈষম্যমূলক’ ও ‘জনগণের সঙ্গে তামাশা’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

তাদের ভাষ্য, বাস্তবে কুতুবপুর, ফতুল্লা, কাশীপুর ও এনায়েতনগর—এই চারটি ইউনিয়নই এখন পূর্ণাঙ্গ নগরাঞ্চল। এখানে হাজার হাজার শিল্প-কারখানা, লাখ লাখ শ্রমিক এবং ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা রয়েছে। ফলে কোনো একটি ওয়ার্ড বা এলাকার ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণ করলে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়বে, নাগরিক সেবায় বৈষম্য সৃষ্টি হবে এবং ভবিষ্যতে উন্নয়ন পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হবে।

জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত প্রস্তাব অনুযায়ী কুতুবপুর ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডই সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু ফতুল্লা, কাশীপুর ও এনায়েতনগরের ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। এনায়েতনগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব থাকলেও ৯ নম্বর ওয়ার্ড সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ফতুল্লা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কেবল একটি অংশ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশের পর থেকেই বাদ পড়া এলাকাগুলোতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

এনায়েতনগর ইউনিয়নের গাবতলী এলাকার বাসিন্দা ও সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম জীবন বলেন, এটা কীভাবে সম্ভব? এনায়েতনগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড সিটি করপোরেশনে নেওয়া হচ্ছে অথচ পাশের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বাদ দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে কাশীপুর ও ফতুল্লা ইউনিয়নের কোনো ওয়ার্ড নেওয়া হচ্ছে, আবার কোনোটি বাদ দেওয়া হচ্ছে। এটাকে আমি জনগণের সঙ্গে চরম তামাশা বলেই মনে করি। বাস্তবতা হলো, ফতুল্লা থানার চারটি ইউনিয়নই এখন শহর এলাকা। এখানে হাজার হাজার শিল্প-কারখানা ও লাখ লাখ শ্রমিকের বসবাস। এখানে কোনো গ্রাম নেই। অনেক আগেই এসব ইউনিয়ন সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা উচিত ছিল। আর এখন যখন নেওয়ার উদ্যোগ হয়েছে, তখন জনগণের সঙ্গে রীতিমতো মশকরা করা হচ্ছে। আমরা এটা মানব না। এখনই ফতুল্লার চারটি ইউনিয়ন সম্পূর্ণভাবে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনতে হবে।

একই ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এনায়েতনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আলমগীর। তিনি বলেন, আমি এনায়েতনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হিসেবে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, বিশেষ কোনো ওয়ার্ড নয় নিতে হলে পুরো ইউনিয়নকেই নিতে হবে। অন্যথায় কোনো ওয়ার্ডকেই সিটি করপোরেশনে নিতে দেওয়া হবে না। এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে আমরা তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলব। জনগণের মতামত উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

এনায়েতনগরের গাবতলী এলাকার বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা হাজী মোহাম্মদ শহীদুল হক বলেন, জানতে পারলাম পুরো কুতুবপুর ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের আওতায় নেওয়া হচ্ছে। অথচ অন্য ইউনিয়নের কোনো ওয়ার্ড নেওয়া হচ্ছে, আবার কোনো ওয়ার্ড বাদ দেওয়া হচ্ছে। এটা চরম অন্যায়। প্রশাসন কার ইশারায় এমন গাজাখুরি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটাই আমাদের প্রশ্ন। আমরা চাই, ফতুল্লার চারটি ইউনিয়নকেই একসঙ্গে সিটি করপোরেশনের আওতায় নেওয়া হোক। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলন ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ থাকবে না।

স্থানীয়দের দাবি, একই ওয়ার্ডের একাংশ সিটি করপোরেশনের অধীনে এবং অপর অংশ ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকলে নাগরিক সেবা, কর ব্যবস্থাপনা, সড়ক উন্নয়ন, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি হবে। এমনকি একটি সড়কের এক পাশ সিটি করপোরেশনের এবং অন্য পাশ ইউনিয়নের অধীনে চলে যাওয়ার মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ফতুল্লা, কাশীপুর ও এনায়েতনগরের যেসব এলাকা বাদ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙাচোরা সড়ক, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ও অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার শিকার। সিটি করপোরেশনের আওতায় না এলে এসব এলাকার উন্নয়নের সম্ভাবনা আরও পিছিয়ে যাবে।

এদিকে, জেলা প্রশাসনের গণবিজ্ঞপ্তিতে কোথাও পুরো ইউনিয়ন এবং কোথাও আংশিক এলাকা অন্তর্ভুক্ত করার যৌক্তিকতা সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। কেবল সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের কাছ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত আপত্তি ও পরামর্শ আহ্বান করা হয়েছে।

এ অবস্থায় বাদ পড়া এলাকাগুলোর বাসিন্দারা বলছেন, জনমত উপেক্ষা করে বর্তমান প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হলে ফতুল্লাজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। তাদের এক দফা দাবি—ফতুল্লা থানার আওতাধীন কুতুবপুর, ফতুল্লা, কাশীপুর ও এনায়েতনগর—এই চারটি ইউনিয়নকে সম্পূর্ণভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যথায় বৈষম্যমূলক এই সীমানা সম্প্রসারণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।