
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন বক্তাবলী ইউনিয়ন পরিষদের নাগরিক সেবা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে আছে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও ১১ মামলার আসামি আব্দুর রশিদ। বারবার গ্রেফতার হওয়া এই বিতর্কিত মেম্বারের রিট ও আইনি মারপ্যাঁচে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে পুরো ইউনিয়ন। প্রকাশ্যে ‘মায়াকান্না’ করে দায়িত্ব না নেওয়ার কথা বললেও, তলে তলে তিনি ফের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হতে প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা হত্যা মামলাসহ ১১টি মামলার আসামি আব্দুর রশিদ। বিভিন্ন অপকর্ম ও ভূমিদস্যুতার অভিযোগে বারবার গ্রেফতার হওয়ার কারণে জেলা প্রশাসন তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদ থেকে অপসারণ করে। এরপর নাগরিক সেবা সচল রাখতে উপজেলা থেকে একজন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে এসেই আব্দুর রশিদ পুনরায় ওই পদ ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
তিনি হাইকোর্টে রিট করে প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন এবং একটি স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) নিয়ে আসেন। এর ফলে গত এক মাস ধরে ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে এবং জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদসহ দৈনন্দিন সব সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ক্ষুব্ধ ইউনিয়নবাসী প্রশ্ন তুলেছেন, “যার কারণে বারবার সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে, সেই বিতর্কিত রশিদের কাছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদে আসলে কী মধু আছে যে তিনি এত মরিয়া?”
সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় আব্দুর রশিদ দাবি করেন, তিনি আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হতে চান না এবং মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত পুনরায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হোক। তবে তার এই বক্তব্যকে ‘নাটক’ ও ‘মায়াকান্না’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
তার বিরুদ্ধে অনাস্থা দেওয়া ৯ জন ইউপি মেম্বারের অভিযোগ, রশিদ মেম্বার মুখে দায়িত্ব না নেওয়ার কথা বললেও, গোপনে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ম্যানেজ করে ফের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হতে উঠেপড়ে লেগেছেন। যিনি নিজেই রিট করে ইউনিয়নের কাজ বন্ধ করেছেন, তার মুখে জনসেবার কথা মানায় না বলে দাবি মেম্বারদের।
এদিকে, এই আসামিকে কোনোভাবেই চেয়ারম্যান পদে মেনে নেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এনসিপি), বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “রশিদের মতো একজন বিতর্কিত ও হত্যা মামলার আসামিকে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া হলে এলাকায় বড় ধরনের সংঘর্ষ ও সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। জেলা প্রশাসন নিশ্চয়ই এ বিষয়টি অবগত আছে।”
বক্তাবলী ইউনিয়নের এই অচলাবস্থা এবং নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) রায়হান কবির উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, “বক্তাবলীর নাগরিক সেবার বিষয়টি নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত। ওখানে একজন মামলার আসামি, তার বিরুদ্ধে আবার আরেকজন মামলা করে রেখেছেন। এর ওপর হাইকোর্ট থেকে প্রশাসক দেওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা (স্থগিতাদেশ) দেওয়া আছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে আমরা আইনসম্মত উপায়ে কী সমাধানে যেতে পারি, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।”
তিনি আরও আশ্বস্ত করে বলেন, “মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত বা চিঠির জবাব এলেই এই সমস্যার সমাধানে আমরা দ্রুত আইনি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
দীর্ঘ এক মাসের অচলাবস্থায় চরম ভোগান্তিতে পড়া বক্তাবলীর সাধারণ মানুষ ও ইউপি সদস্যরা এখন জেলা প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তারা অবিলম্বে আইনি জটিলতা নিরসন করে একজন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়ে ইউনিয়নের কার্যক্রম সচল করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে রশিদ মেম্বারের সাথে যোগাযোগ করতে একাধিকবার কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।







