
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের মধ্যে ৪টিতেই ধানের শীষের প্রার্থীরা বড় জয় পেলেও, ব্যতিক্রম কেবল শিল্পাঞ্চলখ্যাত নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসন। এখানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর পরাজয় স্থানীয় বিএনপিতে এক নজিরবিহীন অভিভাবকহীনতা তৈরি করেছে। কেন্দ্রে বিএনপি ২১২ আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ফতুল্লায় দলের কোনো ‘চেইন অব কমান্ড’ নেই।
৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ সময় ধরে চলা নানা বিশৃঙ্খলা ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শেষে ফতুল্লা বিএনপির প্রভাবশালী নেতারা এখন একেকজন একেক অঞ্চলে নিজস্ব ‘সাম্রাজ্য’ বিস্তার করে বসেছেন। কোনো কেন্দ্রীয় অভিভাবক বা স্থানীয় সংসদ সদস্য না থাকায় এই বিভক্ত সাম্রাজ্যগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যেকোনো সময় পুনরায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প এলাকা ফতুল্লার বিসিক (ইওঝওঈ) এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এখানে প্রায় ৭ শতাধিক গার্মেন্টস ও হোসিয়ারি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই বিশাল সেক্টরের ‘ঝুট ব্যবসা’ নিয়ন্ত্রণ করা মানেই কাঁচা টাকার পাহাড়। গত দেড় বছরে এই ঝুট ব্যবসার দখল নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বারবার রাজপথে গড়িয়েছে।
এছাড়া পঞ্চবটিতে অবস্থিত পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ওয়েল ডিপো; পাগলা ও আলীগঞ্জের পাথর ও বালু মহাল এবং কুতুবপুরের বিশাল লোহা বা রড শিল্প এলাকা এখন একেকজন নেতার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। স্থানীয়দের মতে, এনসিপির প্রার্থী জয়ী হলেও সরকার গঠন করছে বিএনপি। ফলে সরকারি প্রভাব খাটিয়ে এই খণ্ড খণ্ড সাম্রাজ্যগুলো টিকিয়ে রাখতে মরিয়া স্থানীয় নেতারা।
বর্তমানে ফতুল্লা বিএনপির রাজনীতিতে যে কয়েকজন নেতাকে স্থানীয়রা ‘রাজা’ হিসেবে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে সম্বোধন করছেন, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে আধিপত্য বিস্তার ও বিশৃঙ্খলার বিস্তর অভিযোগ।
এদের মধ্যে অন্যতম হলেন, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খান। দীর্ঘকাল বিদেশে ও কারাগারে কাটিয়ে মুক্ত হওয়ার পর তাঁর বিশাল অনুসারী বাহিনী নিয়ে এলাকায় শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। ৫ই আগস্টের পর শহরের বিভিন্ন স্থানে ও ফতুল্লায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে নানা অপকর্ম ও শিল্পাঞ্চলে প্রভাব খাটানোর বহু অভিযোগ রয়েছে। এলাকায় তিনি এখন প্রভাবের এক বড় নাম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মনিরুল আলম সেন্টুর অবস্থান এই তালিকায় দ্বিতীয়। কুতুবপুরের এই নেতার রাজনৈতিক অবস্থান সবসময়ই ‘সুবিধাবাদী’ হিসেবে সমালোচিত। বহিষ্কার ও পুনর্বাসনের খেলায় লিপ্ত সেন্টু কুতুবপুর এলাকায় নিজের একক রাজত্ব কায়েম করেছেন। আওয়ামীলীগ আমলে শামীম ওসমান ও শাহ নিজামের সাথে থেকে দেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন তথা কুতুবপুর ইউনিয়ন সবসময়ই তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিলো। এখনো বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার হওয়ার মধ্য দিয়ে তার নিয়ন্ত্রনেই রয়েছে।
ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রণে একনিষ্ঠভাবে বাহিনী পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শুধু তাই নয়, ০৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মামলা বাণিজ্য ও হামলা-মামলার হুমকি-ধামকি দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের একাধিক অভিযোগও উঠে তার বিরুদ্ধে। এই অভিযোগসহ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে বহিস্কারও করা হয়েছিলো। যদিও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুনরায় পদ ফিরে পাওয়া এই নেতার আধিপত্য ফতুল্লাবাসীর জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
থানা বিএনপির সভাপতি শহীদুল ইসলাম টিটু বিগত আন্দোলন সংগ্রামে নিজের চোখে গুলি লাগাসহ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেও আওয়ামীলীগের পতনের পর বেপরোয়া হয়ে বেশ কয়েকবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের পুনর্বহালসহ তার ভাইদের বিভিন্ন অপকর্মের বিষয়ে বারবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। সভাপতি হিসেবে দায়িত্বশীল হওয়ার কথা থাকলেও, তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিগত বলয় ভারী করতেই বেশি তৎপর ছিলেন বলে জানায় তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনির বিরুদ্ধেও আওয়ামীলীগের ঝুট সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ কাইল্লা রকমত ও তার অনুসারীদের পুনর্বহালের অভিযোগ উঠেছে বারবার। এমনকি কাইল্লা রকমতের সাথে একটি ছবি-ভিডিও ভাইরালও হয় ০৫ আগস্টের পর।
পরবর্তীতে ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব রাসেল মাহমুদ ও তার বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে জড়ানোর অভিযোগও উঠে রনির বিরুদ্ধে। যদিও এইসব ছাপিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চেয়ে এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ নিতে দেখা যায় তাকে। তবে, তার বিরুদ্ধেও রয়েছে ঝুট সেক্টরের দখলের অভিযোগ। তার অনুসারীরা এই সেক্টরের একটি বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানা গেছে।
ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবকদলের সদস্য সচিব রাসেল মাহমুদের বিরুদ্ধেও রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। বিসিকের ঝুট সেক্টরের বড় একটি অংশের দখল তার নিয়ন্ত্রণে থাকায় তিনিও বেশ বেপরোয়া অভিযোগ স্থানীয়দের। এছাড়াও, নিজের চাচীর সাথে পরকীয়া, বিয়ে এবং এই সংক্রান্ত জটিলতায় চাচাকে হত্যার অভিযোগে মামলাও হয় তার বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন জেল খেটে জামিনে মুক্ত হয়ে ফের ঐ সেক্টরে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন রাসেল দাবি স্থানীয়দের।
তবে, এই আসনে বিএনপি জোট সমর্থিত প্রার্থী পরাজীত হওয়ায় এই প্রভাব বিস্তারকারী নেতাদের মধ্যে পুনরায় দ্বন্দ্ব-সংঘাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও শাহ আলম এখন রাজনৈতিকভাবে ‘অস্তিত্ব সংকটে’। তাঁদের সাথে থেকে যারা বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন চরম ঝুঁকিতে।
বিসিক এলাকার এক ক্ষুদ্র ঝুট ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আগে শামীম ওসমান ও তার ভাতিজা আজমেরী ওসমানের দাপটে ব্যবসা করা কঠিন ছিল। এখন দেখি বিএনপির তিন-চার জন নেতা একেক দিকে সাম্রাজ্য বানাইছে। কার কথা শুনবো আর কারে টাকা দেবো বুঝতে পারছি না। কোনো এমপি নাই যে গিয়ে বিচার দিবো।”
পাগলা এলাকার এক সচেতন ভোটার বলেন, “নেতারা এখন নিজেদের এরিয়া ভাগ করে নিছে। কিন্তু এই ভাগাভাগি কতদিন টিকবে? স্বার্থে টান পড়লেই তো এরা নিজেরা নিজেরা মারামারি শুরু করবে। আমরা চাই কোনো একক চেইন অব কমান্ড থাকুক, যাতে শান্তি বজায় থাকে।”
নির্বাচনী ফল প্রকাশের পর থেকে ফতুল্লায় এক ধরণের থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। চেইন অব কমান্ডহীন এই বিশাল শিল্পাঞ্চলে কি শান্তি থাকবে, নাকি ‘রাজাদের’ আধিপত্যের লড়াইয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস উঠবে-সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।







