জীবন-যৌবন দিয়েও আজ দলছাড়া মাঠের কর্মীরা

9
ফতুল্লা বিএনপি নেতাকর্মী
ফতুল্লা বিএনপি নেতাকর্মী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশজুড়ে বড় জয় পেলেও একটি সমীকরণ নিয়ে খোদ বিএনপির ভেতরেই এখন নানা প্রশ্ন উঠছে। সারা দেশে বিএনপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ৪টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল, যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) একটি। কিন্তু দেখা গেছে, এই ৪টি আসনেই জমিয়তের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। এই ফলের পর ফতুল্লা বিএনপির তৃণমূলের সাধারণ কর্মীদের মনে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-যাঁরা দীর্ঘ সময় জীবন-যৌবন বাজি রেখে বিএনপির রাজনীতি করলেন, কেন তাঁদের আজ বহিষ্কৃত হয়ে মাঠের বাইরে থাকতে হবে?

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের রাজনৈতিক পতন নিয়ে এখন চারদিকে সমালোচনা। ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে তাঁর অতিরিক্ত দাম্ভিকতা, সাংবাদিকদের হুমকি প্রদানসহ নানা বিতর্কিত মন্তব্য করার অভিযোগ তাঁর ভাবমূর্তিকে তলানিতে নিয়ে ঠেকায়। এমনকি দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে দুই আসন থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া ছিল পুরোপুরি আত্মঘাতী। বিশেষ করে ফতুল্লায় তাঁর মাত্র ৪ হাজার ৭৯৭ ভোট পাওয়া প্রমাণ করে যে, সাধারণ ভোটাররা তাঁর এই অহংকারকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

নির্বাচনের আগে তিনি দাবি করেছিলেন-বিএনপিতে গণতন্ত্র নেই, টাকা দিয়ে মনোনয়ন কিনতে হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করে তিনি নিজের রাজনীতিকে নিজেই কফিনবন্দী করেছেন। তাঁর এই খামখেয়ালির কারণে তাঁর দুই পুত্র-সাবেক কাউন্সিলর গোলাম মুহাম্মদ সাদরিল এবং অপর ছেলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অনিশ্চয়তায়। তৃণমূলের কর্মীরা বলছেন, গিয়াস উদ্দিনের এই ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ কেবল তাঁর নয়, তাঁর পুরো পরিবারের রাজনৈতিক মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে, মোহাম্মদ শাহ আলমও দলের সিদ্ধান্ত না মেনে নির্বাচন করায় তিনিও বহিষ্কৃত হয়েছেন। তবে ভোটের হিসেবে দেখা গেছে, শাহ আলম প্রায় ৪০ হাজার ভোট পেয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, শাহ আলম একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হওয়ায় তিনি হয়তো ব্যবসায়িক ও সামাজিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন, কিন্তু গিয়াস উদ্দিনের মতো তিনি রাজনৈতিকভাবে এতোটা বিতর্কিত হননি।

সবচেয়ে বড় আলোচনা চলছে ফতুল্লা বিএনপির সেইসব নেতাদের নিয়ে, যাঁরা বছরের পর বছর দলের জন্য রাজপথে ত্যাগ স্বীকার করেছেন। ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জাহিদ হাসান রোজেল, জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম পান্না মোল্লা, কাশিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মঈনুল হোসেন রতন, ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান আলী, কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি বিল্লাল হোসেনসহ আরও অনেক উদীয়মান ও মেধাবী নেতা আজ বহিষ্কৃত।

তৃণমূলের দাবি, এই নেতারা শাহ আলম বা গিয়াস উদ্দিনের দীর্ঘদিনের সহচর হওয়ায় আবেগের বশবর্তী হয়ে তাঁদের পক্ষে কাজ করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের অতীত ত্যাগ অনস্বীকার্য। সাধারণ কর্মীরা বলছেন, “জমিয়ত তো কোথাও জিততে পারল না, অথচ তাঁদের জন্য আমাদের ঘরের সন্তান তুখোড় নেতাদের কেন বাইরে রাখা হবে?”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যেহেতু জোটের প্রার্থী শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারেননি এবং ফতুল্লা এখন অভিভাবকহীন, তাই দলের উচিত এই তরুণ ও ত্যাগী নেতাদের বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করা। ব্যক্তিগত ভুলের চেয়ে দলের প্রতি তাঁদের দীর্ঘদিনের আনুগত্যকে বড় করে দেখা দরকার। গিয়াস উদ্দিনের মতো দাম্ভিক নেতার রাজনৈতিক অপমৃত্যু ঘটলেও, রোজেল-রতন-মিঠুদের মতো উদীয়মান নেতাদের পুনরায় দলে ফিরিয়ে আনা ফতুল্লা বিএনপির চেইন অব কমান্ড ফেরানোর জন্য জরুরি।

এখন দেখার বিষয়, বিএনপি হাইকমান্ড এই ত্যাগী নেতাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তাঁদের পুনর্বাসিত করে কি না, নাকি বড় নেতাদের ভুলের খেসারত এই তরুণদের সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।

“আরও পড়ুন: [সাখাওয়াতের প্রশাসক পদ কি আগামী নির্বাচনের টেস্ট পরীক্ষা?]