
আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলীয় প্রভাব ও পেশিশক্তি খাটিয়ে ফতুল্লার আলীরটেক ইউনিয়নে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বার রওশন আলী। মানুষের ব্যক্তিগত জমি দখলের পাশাপাশি তিনি গিলে খেয়েছেন সরকারি নদীও। এতদিন তার বিরুদ্ধে নদী দখলের অভিযোগ থাকলেও, এবার খোদ নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সরকারি নথিতেই রওশন মেম্বারকে ধলেশ্বরী নদীর ‘অবৈধ দখলদার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, জুলাই-আগস্টের ছাত্র হত্যা মামলায় জামিনে বেরিয়ে এই ‘নদী খেকো’ মেম্বার এখন আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংগঠিত করতে শুরু করেছেন গোপন বৈঠক।
আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থাকা রওশন মেম্বার কতটা প্রভাবশালী ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে জেলা প্রশাসনের নথিতে। গত ৪ জুন ২০২৫ তারিখে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে পাঠানো জেলা প্রশাসকের এক প্রতিবেদনে জেলার নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করা হয়।
সেই তালিকার ৫ নম্বরেই রয়েছে রওশন আলীর নাম। নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সদর উপজেলার গোপচর মৌজায় ধলেশ্বরী নদীর ৯১০ বর্গফুট জায়গা দখল করে রওশন মেম্বার তার বাবার নামে ‘আব্দুল কাদের ব্রিকস’ নামের অবৈধ ইটভাটা গড়ে তুলেছেন। সরকারি সেই নথিতে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ না করতে পারার কারণ হিসেবে ‘স্থানীয় প্রভাবের’ কথা উল্লেখ করেছিল তৎকালীন প্রশাসন! এলাকাবাসীর মতে, এই ‘স্থানীয় প্রভাব’ বলতে সরাসরি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের শেল্টারকেই বোঝানো হয়েছে, যার কারণে প্রশাসনও তার কাছে অসহায় ছিল।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নদী দখলের এই বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা একটি জোরালো বার্তা দেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, “নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। যারা অবৈধভাবে নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা বা ইটভাটা গড়ে তুলেছে, তাদের কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে এবং খুব শিগগিরই রওশন আলীসহ অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
সরকারি নদী গিলে খাওয়া এই রওশন মেম্বারের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সিদ্ধিরগঞ্জে ‘হাফেজ সোলাইমান হত্যা’ মামলায় দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর সম্প্রতি জামিনে বের হন তিনি। আর জামিনে এসেই তিনি পুনরায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
এলাকাবাসী জানান, দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে সম্প্রতি মাসদাইরে তার নিজ বাসভবনে একটি বড় গোপন বৈঠক করেন রওশন। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এনায়েতনগর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলু মুহুরী, তার ভাতিজা একাধিক মামলার আসামি মামুন ওরফে নাডা মামুন এবং আওয়ামী লীগ নেতা নোয়াখাইল্লা মামুনের দুই ছেলে- নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতা সৌরভ ও সৈকত। তাদের সঙ্গে ফতুল্লা আওয়ামী লীগের আরও বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী এই বৈঠকে অংশ নেন।
গোপন বৈঠক করা মাসদাইরের এই ভবনটি নিয়েও রয়েছে বড় জালিয়াতি। বিশাল জায়গা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ১২ তলা এই নির্মাণাধীন বহুতল ভবনটির রাজউকের (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) কোনো অনুমোদন বা নকশা পাস করা নেই। সাধারণ মানুষের জায়গা দখল ও মাটি বিক্রির কোটি কোটি অবৈধ টাকা বৈধ করতেই ভবনের নিচে মাদ্রাসার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে এই আলিশান ভবন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
এছাড়াও, দিদার হোসেন নামে একজনকে তুলে নিয়ে হত্যা করা, তাদের বসতবাড়ি দখল, আদালতের রায় অমান্য করে প্রায় ৭ কোটি টাকার মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া সহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে রওশন আলী ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে। এলাকাবাসী জানান, রওশনের বাবা কাদের মিয়া পেশায় একজন সাধারণ জেলে ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে রাতারাতি তিনি কোটিপতি বনে যান। মাসদাইরের এই অনুমোদনহীন ১২ তলা ভবন ও ধলেশ্বরী নদীর জায়গায় অবৈধ ইটভাটা, আলীরটেকে আলিশান বাড়ি এবং কক্সবাজারে একটি ৬ তলা রিসোর্ট ছাড়াও নামে-বেনামে বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে। তার ভাই জুলকারনাইন হজ এজেন্সি ও মাদ্রাসার নাম করে মানুষের বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী ধলেশ্বরী নদী দখল করে বানানো রওশনের অবৈধ ইটভাটা এবং মাসদাইরে রাজউকের অনুমোদনহীন ভবন অবিলম্বে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে, রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে হত্যা মামলার আসামি রওশন মেম্বার, ফজলু মুহুরী, নাডা মামুন এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা সৌরভ ও সৈকতসহ এই চক্রটিকে দ্রুত পুনরায় গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
অভিযুক্ত রওশন আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তিনি বলেন, এই তালিকা সম্পূর্ণই ভুল।
পরে তাকে আবার জানানো হয় যে, এই তালিকা জেলা প্রশাসন থেকে করা হয়েছে, আর আপনি বলছেন, সম্পূর্ণটাই ভুল। তখন তিনি তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসে বলেন, আমি কেন ভুল বলবো। তারা দেখুক।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবির বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই খালগুলো উদ্ধার করেছি। নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনো ছাড় দেয়া হবে না।







