রিট করে সেবা বন্ধ রেখে প্রশাসকের জন্য রশিদের ‘মায়াকান্না’!

১১ মামলার আসামির সাধু সাজার হাস্যকর চেষ্টা

4
বক্তাবলী ইউপি মেম্বার আব্দুর রশিদের বিরুদ্ধে নদী দখল ও হত্যা মামলার অভিযোগ।
মামলার আসামি হয়েও নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন বক্তাবলীর বিতর্কিত মেম্বার আব্দুর রশিদ।

চারদিক থেকে মেম্বারদের অনাস্থা, মামলা এবং প্রশাসনের চাপের মুখে পড়ে এবার নিজেকে ‘সাধু’ প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলীর বিতর্কিত মেম্বার আব্দুর রশিদ। সম্প্রতি একটি পোর্টালে দেওয়া ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে তার দেওয়া বক্তব্যের পরতে পরতে ধরা পড়েছে চরম মিথ্যাচার ও স্ববিরোধিতা।

রিট করে সেবা বন্ধ, আবার প্রশাসকের জন্য মায়াকান্না!
সাক্ষাৎকারে রশিদের সবচেয়ে হাস্যকর দাবিটি ছিল— “মানুষের ভোগান্তি কমাতে আমি চাই ঈদের পর প্রশাসক নিয়োগ করে সেবা সচল করা হোক।”

অথচ বাস্তবতা হলো, বিগত কয়েক মাস উপজেলা প্রশাসনের নিয়োগকৃত একজন প্রশাসকের অধীনেই সুন্দরভাবে চলছিল ইউনিয়ন পরিষদ। কিন্তু এই রশিদ মেম্বারই নিজের ক্ষমতা ফিরে পেতে হাইকোর্টে রিট করে স্টে অর্ডার আনেন এবং প্রশাসকের কাজ আটকে দেন। যে ব্যক্তি নিজে রিট করে হাজার হাজার মানুষের সেবা বন্ধ করে দিলেন, তার মুখে এখন জনসেবা সচল করার দাবিকে ‘কুমিরের কান্না’ বলছেন খোদ ইউপি সদস্যরা!

দাবি বনাম সরকারি নথি:
ভিডিও সাক্ষাৎকারে আব্দুর রশিদ দাবি করেন, তিনি কোনো ভূমিদস্যু নন। কেউ তার বিরুদ্ধে এক শতাংশ জমি দখলের প্রমাণ দিতে পারলে তিনি শাস্তি মাথা পেতে নেবেন।

তবে, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘অবৈধ নদী দখলদারদের তালিকা’ থেকে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি ওই তালিকা অনুযায়ী, আব্দুর রশিদ অবৈধভাবে নদীর ৮০০ বর্গফুট জায়গা দখল করে রেখেছেন। সরকারি খাতায় চিহ্নিত দখলদার হওয়ার পরও তার এমন দাবি জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।

১১ মামলার স্বীকারোক্তি: ৫টিই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র হত্যার!
রশিদ মেম্বার দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে ২২টি নয়, বরং ১১টি মামলা চলমান। এর মধ্যে ৫টি মামলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনের। সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন, ১১টি রানিং মামলা থাকা (যার মধ্যে ছাত্র হত্যার মতো গুরুতর মামলা রয়েছে) একজন ব্যক্তি কীভাবে প্রকাশ্যে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার স্বপ্ন দেখেন? তিনি দাবি করেছেন ছাত্র হত্যার সময় তিনি বিদেশে ছিলেন। এলাকাবাসীর দাবি, তার পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন রেকর্ড চেক করলেই এই সত্য-মিথ্যা বের হয়ে আসবে।

অপসারিত হয়েও ফেসবুকে ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’:
নানা বিতর্কের কারণে জেলা প্রশাসন তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদ থেকে অপসারণ করে। কিন্তু ক্ষমতা না থাকার পরও আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আব্দুর রশিদ তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে নিজেকে ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ উল্লেখ করে শুভেচ্ছা ব্যানার পোস্ট করেছেন। পদ না থাকার পরও প্রকাশ্যে এমন পদবি ব্যবহার করাকে প্রশাসনের প্রতি অবজ্ঞা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা বলে মনে করছেন পরিষদের অন্যান্য সদস্যরা।

এত সম্পদের উৎস কোথায়?
নিজেকে চাঁদাবাজ ও ভূমিদস্যু নয় প্রমাণ করতে গিয়ে রশিদ মেম্বার নিজের বিশাল সম্পদের ফিরিস্তি দিয়েছেন। তিনি জানান, তার ৩টি ব্রিক ফিল্ড, ৩টি বালুর জাহাজ ও এস্কেভেটরের ব্যবসা রয়েছে এবং তিনি ৫৭ লক্ষ টাকা ভ্যাট দেন ও ১১ লক্ষ টাকা ইনকাম ট্যাক্স দেন সরকারকে। একজন ইউপি মেম্বারের এত বিশাল সম্পদের উৎস নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ মানুষের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করলেই তার এই ‘আলাদীনের চেরাগের’ আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে।

বিএনপি নেতাদের নাম ভাঙিয়ে বাঁচার চেষ্টা
জামায়াতে ইসলামী জোট থেকে মনোনয়ন পেয়ে জয়ী এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন, স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপি এবং ৯ জন ইউপি মেম্বার তাকে সরাসরি বয়কট করেছেন। এই অবস্থায় দিশেহারা হয়ে রশিদ মেম্বার এখন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব রনিসহ শীর্ষ নেতাদের নাম ভাঙাচ্ছেন। তিনি দাবি করেছেন, ২০২১ সালে তিনি তাদের সাথেই জেলে ছিলেন। তবে স্থানীয় বিএনপির কর্মীরা বলছেন, “আগে কে কার সাথে জেলে ছিল সেটা বিষয় নয়, ৫ আগস্টের পর রশিদের দখলবাজি এবং ছাত্র হত্যা মামলার আসামি হওয়াটাই প্রমাণ করে সে আসলে কার লোক। বিএনপি কখনো এমন দাগী আসামির দায় নেবে না। এছাড়াও রশিদের দাবির বিষয়ে জানতে, যুবদল সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি দেশের বাইরে থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সহকর্মীদের ওপর হামলার দায় অস্বীকার
নারী মেম্বার হাসনা বানুকে গুমের হুমকি এবং আকিল মেম্বারকে কুপিয়ে জখমের কথাও অস্বীকার করেছেন রশিদ। তিনি সিসিটিভি ফুটেজ দেখার চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন। ভুক্তভোগী মেম্বাররা অবিলম্বে ফতুল্লা থানা পুলিশকে ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হওয়ার আগেই জব্দ করার দাবি জানিয়েছেন।

এলাকাবাসী বলছেন, নিজের অপকর্ম ঢাকতে মিডিয়ার সামনে এসে ভালো মানুষ সাজার এই নাটক বক্তাবলীর মানুষ বিশ্বাস করবে না। দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বক্তাবলীকে এই ১১ মামলার আসামির হাত থেকে রক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বক্তব্য জানতে কল করলেও রিসিভ করেননি:
ভিডিও সাক্ষাৎকারে আব্দুর রশিদের দেওয়া বক্তব্য, জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে নদী দখলের তালিকা এবং হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের বিষয়ে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জানতে এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে তার মুঠোফোনে একাধিকবার (৩ বার) কল করা হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি। এছাড়া, তার হোয়াটস অ্যাপে ক্ষুদে বার্তা (ম্যাসেজ) পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেন নি।