অবশেষে অবসান ঘটছে দীর্ঘ কারাবাসের, মুক্তির দ্বারপ্রান্তে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী

75
অবশেষে অবসান ঘটছে দীর্ঘ কারাবাসের, মুক্তির দ্বারপ্রান্তে আইভী
অবশেষে অবসান ঘটছে দীর্ঘ কারাবাসের, মুক্তির দ্বারপ্রান্তে আইভী

দীর্ঘ কয়েক মাসের কারাবাস, একের পর এক মামলা, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের ধারাবাহিক শুনানি এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর অবশেষে মুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সকল মামলায় জামিন বহাল থাকায় আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই তিনি কারামুক্ত হতে পারেন।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৯ মে ভোররাত প্রায় ৩টা থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ এক অভিযানের পর সকাল পৌনে ৬টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় অবস্থিত তাঁর বাসভবন ‘চুনকা কুটির’ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত হত্যা, হামলা ও নাশকতার ঘটনায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচটি মামলা ছিল।

আইভীর গ্রেপ্তারের খবরে ওইদিন রাতেই দেওভোগ এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষ চুনকা কুটিরের সামনে জড়ো হয়ে এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

গ্রেপ্তারের পর ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে প্রথমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের হওয়া তিনটি হত্যা মামলা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তবে পরবর্তীতে একের পর এক নতুন মামলায় তাঁকে ‘শো-ন অ্যারেস্ট’ (Shown Arrest) দেখাতে থাকে রাষ্ট্রপক্ষ। ফলে একটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁকে কারাগারে আটকে রাখা হয়। বিষয়টি নিয়ে তাঁর আইনজীবীরা আদালতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ তোলেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৯ নভেম্বর প্রথম দফায় পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পান আইভী। কিন্তু ওইদিনই তাকে আরও পাঁচ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি নতুন পাঁচ মামলায়ও ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান তিনি। এরপর আবারও সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পৃথক দুটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এসব মামলার একটিতে ২ মার্চ এবং অন্যটিতে ১২ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।

পরবর্তীতে উচ্চ আদালত একের পর এক মামলায় তাঁর জামিন মঞ্জুর করতে থাকেন। গত ১০ মে আপিল বিভাগ আইভীর বিরুদ্ধে থাকা ১০টি মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রাখেন। এছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জ থানার আরও দুটি মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনও চেম্বার আদালত খারিজ করে দেন। এর ফলে বর্তমানে তাঁর মুক্তিতে আর কোনো কার্যকর আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতের আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র (জামিননামা) কারাগারে পৌঁছানো এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই মুক্তি পাবেন আইভী। ইতোমধ্যে এই খবরে তাঁর পরিবার, অনুসারী এলাকাবাসীর উদ্বেগ কেটে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মুক্তি নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতির একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও আলোচিত মুখ। উন্নয়ন, নাগরিক সেবা ও নিজস্ব অনড় রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে যেমন তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, তেমনি বিভিন্ন সময় ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের কারণেও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন।

২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান (মেয়র) নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর মূল রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠনের পর টানা তিনবার ভারী ব্যবধানে মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশের অন্যতম আলোচিত নারী রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে নিজের অবস্থান পাকা করেন। দীর্ঘ কারাবাসের পর মুক্ত হয়ে তিনি আবারও রাজনীতিতে ফিরবেন কিনা সেটিই এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।