টিপুর আচরণে বিব্রত হচ্ছে দল, মুখ খুলতে বাধ্য হলেন বাঁধন

107
টিপুরের আচরণে বিব্রত হচ্ছে দল: মুখ খুলতে বাধ্য হলেন বাঁধন
টিপুরের আচরণে বিব্রত হচ্ছে দল: মুখ খুলতে বাধ্য হলেন বাঁধন

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সামনে দুই নারী হকারকে বসানো নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এক নারী আইনজীবীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্থা এবং পরবর্তীতে নারী আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত আপত্তিকর, অশ্লীল ও অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর বিরুদ্ধে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর এবার আদালত পাড়ায় খোদ সহকর্মী আইনজীবীকে নর্তকী সহ অশ্রাব্য ভাষায় সম্বোধন করার ঘটনায় তীব্র বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে তাঁর দল বিএনপি।

ইতোমধ্যেই এই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ও বিভিন্ন মিডিয়ার ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে ফুঁসে উঠেছেন সাধারণ আইনজীবীরা। এরই ধারাবাহিকতায় আজ রোববার কোর্ট চলাকালীন সময় দুপুর ১২টায় অ্যাডভোকেট টিপু ও অ্যাডভোকেট রফিক আহমেদের বিরুদ্ধে আদালত প্রাঙ্গণে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন আইনজীবীরা। এই মানববন্ধনে অংশ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালামের কন্যা অ্যাডভোকেট সামছুন নূর বাঁধন।

মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ উগরে দেন অ্যাডভোকেট সামছুন নূর বাঁধন। তিনি বলেন, “আমি এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা আদালতে সবাই একসাথে কাজ করি, একে অপরের আত্মীয়ের মতো হয়ে যাই। পেশাগত কাজ করতে গেলে ভুল বোঝাবুঝি বা ঝগড়া-বিবাদ হতেই পারে; তাই বলে একজন আইনজীবী হয়ে আরেকজন নারী সহকর্মীকে এভাবে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা, আক্রমণ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নারী আইনজীবীদের ‘নর্তকী’ ও ‘পুরুষখেকো’সহ অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলায় আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”

আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দের কাছে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করে বাঁধন সরাসরি বিএনপির হাইকমান্ডের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “রাষ্ট্র মেরামতের যে ৩১ দফা রূপরেখা দেয়া হয়েছে, সেখানে নারীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের হাইকমান্ডের কাছে আমার অনুরোধ—নারীদের সুরক্ষার বিষয়ে এবং এই ধরনের আচরণকারীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।”

ভুক্তভোগী নারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমেনা প্রধান শিল্পী জানান, বার ভবনের সামনে দুই নারী হকার বসে খাবার বিক্রি করায় আইনজীবীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছিল। বিষয়টি তিনি বারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে জানালে সভাপতি নিজে এসে হকারদের অন্যত্র সরে যেতে বলেন। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট রফিক ও অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু ওই নারী আইনজীবীর ওপর চড়াও হন। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজের একপর্যায়ে তাঁর বুকের সিনায় সজোরে ঘুষি মারা হয় বলেও লিখিত অভিযোগে জানান তিনি।

ভুক্তভোগী ওই নারী আইনজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হলেও আইন পেশায় টিপু আমার অনেক জুনিয়র। একজন জুনিয়র হয়ে একজন সিনিয়রকে, একজন নারীকে এভাবে মারধর ও শ্লীলতাহানি করার বিচার আমি চাই।” এই ঘটনায় তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। অন্যদিকে, অ্যাডভোকেট টিপু গণমাধ্যমের সামনে এসে নিজের দোষ ঢাকার চেষ্টা করে উল্টো ওই নারী আইনজীবীসহ অন্য নারী আইনজীবীদের ‘নর্তকী’ ও ‘অশ্লীল’ বলে নতুন বিতর্কের জন্ম দেন।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারায়ণগঞ্জ মহানগর ও থানা বিএনপির একাধিক শীর্ষ ও তৃণমূল নেতাকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে অ্যাডভোকেট টিপু যেন পুরো জেলায় এক বেপরোয়া ও স্বৈরাচারী রাজত্ব কায়েম করেছেন। তাঁর একের পর এক অপকর্মে দল আজ সাধারণ মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারছে না।

এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টিপু এখন আর কারো কথা শোনে না। মানুষের সাথে তার আচরণ অত্যন্ত রূঢ় ও অহংকারী। সে এখন কাউকেই মানুষ মনে করে না। দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের সে নিজের বাড়ির কাজের লোক মনে করে এবং সেই অনুসারেই দাসসুলভ আচরণ করে। তাঁর এই ঔদ্ধত্যের কারণে দলের ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে।”

উল্লেখ্য, ৫ আগস্টের পর থেকেই একের পর এক সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন টিপু। হত্যা মামলায় নিজের দলের নিরীহ নেতাকর্মীদের নাম জড়িয়ে ফাসিয়ে দেওয়ার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিলো তাঁর বিরুদ্ধে। চাষাঢ়ায় ট্যাক্সি স্ট্যান্ড দখলে নিতে গিয়ে সাধারণ ড্রাইভারদের রোষানলে পড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। গঞ্জে আলী খাল পরিষ্কারের সময় ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের নামে জায়গা দখলের অভিযোগ নিয়ে জাতীয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিউজ প্রকাশিত হয়।

ফুটপাতে বিদ্যুতের লাইন চুরি ও হকারদের কাছ থেকে দৈনিক চাঁদাবাজির মাস্টারমাইন্ড হিসেবে টিপুর ভাই বিল্লালের নাম উঠে এসেছে বারবার। হকার উচ্ছেদের পর নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানকে হকারদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে বলে হুংকার দেওয়া কুখ্যাত জুয়াড়ি ও বিদ্যুৎ চোর শাহজাহানকে আদালত পাড়ায় বক্তব্যের সময় ঠিক টিপুর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মূলত টিপুর মদদেই এই অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠে বলে বারবার চাউর হয়। হকারদের উচ্ছেদের দিন টিপুর উপর রাগ করে যুবদল নেতা শাহেদ আহমেদ মাইক ছুড়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এবার ঘরের ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়া এই নেতার বিরুদ্ধে দল ও আইনজীবী সমিতি কী ব্যবস্থা নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।