সাখাওয়াত-কালাম ঐক্যে বদলাবে কি নারায়ণগঞ্জ?

23
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ ও নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ ও নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান

নারায়ণগঞ্জকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আয়তনে তুলনামূলক ছোট হলেও জনসংখ্যার ঘনত্ব, শিল্প-বাণিজ্যের ব্যাপকতা এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদানের কারণে এই শহরের গুরুত্ব অনেক বেশি। এক সময় বিশ্ববিখ্যাত পাট বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল নারায়ণগঞ্জ। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এ শহরকে ‘ডান্ডি অব দ্য ইস্ট’ বলেও অভিহিত করা হয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে পাটশিল্পের সেই জৌলুস কমলেও গার্মেন্টস, হোসিয়ারি, খাদ্যপণ্য, পরিবহন, নির্মাণসামগ্রী এবং পাইকারি বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে এখনও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে নারায়ণগঞ্জ।

ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে শহরটিতে মানুষের বসতিও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ জীবিকার সন্ধানে এসে ভিড় জমাচ্ছে এই শহরে। ফলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, যানজট, জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখল, ময়লা ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন নগরবাসীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমন একটি বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালামের মধ্যে সমন্বয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নগর উন্নয়ন এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে দুই নেতার মধ্যে একটি কার্যকর বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই সমন্বয় অনেকের কাছেই ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অনেক শহরেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায় কিংবা বাস্তবায়ন বাধার মুখে পড়ে। সেই দিক থেকে নারায়ণগঞ্জে যদি প্রশাসক ও সংসদ সদস্য একসঙ্গে কাজ করতে পারেন, তাহলে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে গতি আসতে পারে।

নগরবাসীর একটি বড় অংশ মনে করে, জলাবদ্ধতা নিরসন, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ, যানজট নিয়ন্ত্রণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, খাল পুনরুদ্ধার, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আর এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই সমীকরণকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমতও রয়েছে। বিএনপির একটি অংশের নেতাকর্মী ও পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, দলীয় রাজনীতির অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধারা ও বলয় বিদ্যমান। ফলে কোনো দুই নেতার ঘনিষ্ঠতা বা সমন্বয়কে সবাই একইভাবে দেখবেন, এমনটি স্বাভাবিক নয়। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী হিসাব-নিকাশও অনেক সময় এসব সম্পর্কের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি বরাবরই বহুমাত্রিক। এখানে ব্যক্তি-প্রভাব, সাংগঠনিক শক্তি, ব্যবসায়ী মহলের অবস্থান এবং স্থানীয় জনমতের সমন্বয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়। ফলে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা ঐক্যের প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করে সেটি কতটা জনকল্যাণমূলক ফলাফল বয়ে আনতে পারছে তার ওপর।

নগরবাসীর প্রত্যাশাও সেখানেই। তারা রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতায় ভোগা এলাকাগুলোর স্থায়ী সমাধান, যানজটমুক্ত সড়ক, নিরাপদ নগর পরিবেশ, দখলমুক্ত ফুটপাত এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলেই জনগণ এই সমন্বয়ের ইতিবাচক মূল্যায়ন করবে বলে মনে করছেন অনেকে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও অ্যাডভোকেট আবুল কালামের মধ্যে গড়ে ওঠা সমন্বয় যদি বাস্তব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়, তাহলে তার সুফল সরাসরি নগরবাসী পাবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক মতভেদ, অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যদি সামনে চলে আসে, তাহলে সেই সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাখাওয়াত-কালাম সমীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে এই সমন্বয়ের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বরং নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে দৃশ্যমান পরিবর্তন কতটা আনা যায়, তার ওপর। সময়ই বলে দেবে এই সমীকরণ নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, নাকি রাজনৈতিক বিতর্কের আরেকটি অধ্যায়ে পরিণত হবে।