
১১ শত কোটি টাকার বিশাল ঋণখেলাপির দায়ে অভিযুক্ত এবং বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ বজলুর রহমান এবার ক্ষমতার পটপরিবর্তনের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি পদ বাগিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেওয়া তাঁরই স্বাক্ষরিত একটি আবেদনপত্রের কপি ফাঁস হওয়ার পর স্থানীয় সচেতন মহল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আবেদনপত্রটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১১ শত কোটি টাকার বিশাল ঋণখেলাপির দায়ে জর্জরিত এম আর গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআই-এর সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ বজলুর রহমান সোনারগাঁও উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের ‘হোসেনপুর শম্ভুপুরা পিরোজপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়’-এর অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হতে জেলা প্রশাসকের কাছে জোর তদ্বির করছেন।
শুধু তাই নয়, আবেদনে তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) আসনের বর্তমান লড়াকু সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। অথচ স্থানীয়দের দাবি, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবং এফবিসিসিআই-এর পদ ধরে রাখতে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সাথে তাঁর দহরম-মহরম ছিল ওপেন সিক্রেট। এখন ক্ষমতার পরিবর্তন হতেই তিনি নিজেকে ‘বঞ্চিত’ সাজিয়ে এমপির বিরুদ্ধে মিথ্যা কুৎসা রটনা করে স্কুলের নিয়ন্ত্রণ নিতে জেলা প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।
স্থানীয়রা জানান, একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি পদে এমন একজন ব্যক্তি বসার চেষ্টা করছেন, যাঁর নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ আছে; তদুপরি তাঁর ব্যবসায়িক ও নৈতিক রেকর্ড চরমভাবে বিতর্কিত। জাতীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, মোহাম্মদ বজলুর রহমানের মালিকানাধীন এম আর গ্রুপের অধীনস্ত ‘বি আর স্পিনিং মিলস’-এর কাছে চার ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১,১০০ কোটি টাকা, যা সম্পূর্ণ খেলাপি ঋণ। যার মধ্যে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকেরই পাওনা ৫৭৪ কোটি টাকা। মহান জাতীয় সংসদে ঘোষিত দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকায় ১০ নম্বরে রয়েছে সোনারগাঁওয়ের এই বজলুর নাম। এর আগে খেলাপি ঋণের দায়ে বজলু পরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নিলামেও তোলা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, তাঁর বড় ভাই ফজলুর রহমানও ব্যাংকের একজন বড় ঋণখেলাপি ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ঋণখেলাপি অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেন।
বিগত সরকারের সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে দহরম-মহরম সম্পর্ক থাকার কারণে পর্যাপ্ত রপ্তানি না করেও বা নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে পরিচালনা না করেও সিআইপি (CIP) পদ বাগিয়ে নেন আওয়ামী ঘনিষ্ঠ এই বজলু। আর এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্ট গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও প্রাইম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কর্ণধার আবু জাফর আহম্মেদ বাবুল (প্রাইম বাবুল) তৎকালীণ সময়ে বলেন, “বজলুর রহমান আসলে সিআইপি কার্ড পেয়েছেন কিনা আমি জানি না, আর পেলেও কবে নাগাদ পেয়েছেন সেটাও জানি না। যদি পেয়ে থাকেন, তাহলে সরকারের (আওয়ামীলীগ সরকারের) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে পেয়েছেন। কারণ তাঁর তেমন কোনো এক্সপোর্ট নেই। আমি যে পরিমাণ এক্সপোর্ট করি, তার চার ভাগের এক ভাগও তিনি এক্সপোর্ট করেন না। সিআইপি নির্ধারণ করা হয় ব্যবসায়িক পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু আমাদের এখানে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মূল্যায়ন না করে যারা লুটপাট চালায় তাদের মূল্যায়ন করা হয়। তাঁর মতো একজন চিহ্নিত ঋণখেলাপি সিআইপি কার্ড পেলে সেটা প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য চরম হতাশার কারণ।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক ব্যবসায়ী জানান, বজলুর এক্সপোর্ট মূলত জিরো। তিনি ব্যাংক থেকে লুট করা টাকা খরচ করে সমাজে অবৈধ প্রভাব বিস্তার করে আছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বজলুর ভাই রেজাউল করিম গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীকের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু বিগত ১৭ বছর ধরে দলের ক্রান্তিকালে তাঁর নিষ্ক্রিয়তা এবং শীর্ষ ঋণখেলাপি পরিবার হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় দল তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি। দল এই আসনে মনোনয়ন দেয় লড়াকু সৈনিক আজহারুল ইসলাম মান্নানকে। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রেজাউল করিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। ফলে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধে দলের সব পর্যায়ের পদ এমনকি সাধারণ সদস্য পদ থেকেও রেজাউল করিমকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে বিএনপি। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি মাত্র ৪ হাজার ভোট পান এবং চরম অবমাননাকরভাবে জামানত হারান।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বজলুর মতো শীর্ষ ঋণখেলাপিরা জনগণের আমানত ও খেলাপি ঋণের বড় অংশই হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন, যা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ। যেকোনো সময় তাঁর মতো ঋণখেলাপীরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে।
এমতাবস্থায় স্থানীয় অভিভাবক, এলাকাবাসী ও শিক্ষানুরাগীদের প্রশ্ন—যে ব্যক্তি ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের অন্যতম কারিগর হিসেবে সংসদে তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তিনি কোন নৈতিকতায় একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তহবিল এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিতে চান?
এলাকাবাসী ও ছাত্রনেতাদের স্পষ্ট বক্তব্য, কোনো ব্যাংক ডাকাত, আর্থিক কেলেঙ্কারির হোতা কিংবা ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী ভোল্টপাল্টানো ব্যবসায়ীকে আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ারে বসতে দেওয়া হবে না। হোসেনপুর শম্ভুপুরা পিরোজপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়কে এই লুটেরার হাত থেকে রক্ষা করতে জেলা প্রশাসকের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সর্বস্তরের জনগণ।
এসব বিষয়ে জানতে বজলুর রহমানকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি। তার হোয়াটস অ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো রিপ্লাই দেন নি।







