সব নিয়ম ভেঙে স্কুলের সভাপতি হলেন ঋণখেলাপি বজলু: শিক্ষা বোর্ডের আদেশে সোনারগাঁয়ে তীব্র ক্ষোভ

বজলুর রহমান দরখাস্ত ছাড়া কোনো কাগজই দেননি, যাচাই করব কীভাবে: এডিসি

233
নিয়ম ভেঙে স্কুল দখলে ঋণখেলাপি বজলু, সোনারগাঁয়ে তীব্র ক্ষোভ
নিয়ম ভেঙে স্কুল দখলে ঋণখেলাপি বজলু, সোনারগাঁয়ে তীব্র ক্ষোভ

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সব নিয়মকানুন অমান্য করে শেষ পর্যন্ত সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘হোসেনপুর শম্ভুপুরা পিরোজপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়’-এর সভাপতি পদ দখল করে নিয়েছেন শীর্ষ ব্যাংক ঋণখেলাপি মোহাম্মদ বজলুর রহমান। গত ৮ জুন ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে তাকে সভাপতি করে একটি চিঠি (প্রজ্ঞাপন) জারি করা হয়েছে। স্কুলের পাঠানো প্যানেল এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সুপারিশ বাদ দিয়ে একজন চিহ্নিত ঋণখেলাপিকে স্কুলের দায়িত্ব দেওয়ায় পুরো সোনারগাঁয়ে সাধারণ মানুষ ও ছাত্র-জনতার মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের নিয়ম অনুযায়ী, স্কুলের সভাপতি বানানোর জন্য প্রধান শিক্ষক ৩ জন যোগ্য ও শিক্ষিত মানুষের নাম লিখে শিক্ষা বোর্ডে পাঠাবেন এবং বোর্ড সেই ৩ জনের মধ্য থেকে যেকোনো একজনকে সভাপতি হিসেবে বেছে নেবে। প্যানেলের বাইরের কাউকে সভাপতি করার কোনো ক্ষমতা শিক্ষা বোর্ডের নেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ ওমর ফারুক মিয়াজী নিয়ম মেনেই ৩ জন যোগ্য ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তির নাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)-এর মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠান। সোনারগাঁয়ের ইউএনও আসিফ আল জিনাত গত ৫ মে সরকারি চিঠিতে জানান যে, ওই ৩ জন প্রার্থীর নামে কোনো খারাপ রেকর্ড নেই এবং তাঁরাই স্কুলের জন্য যোগ্য। কিন্তু সেই ৩ জনের তালিকা বাদ দিয়ে পেছন দরজা দিয়ে ৪ নম্বর ব্যক্তি হিসেবে বজলুর রহমানকে সভাপতি করা হয়।

স্কুলের বৈধ ৩ জনের নাম বাদ দিয়ে কেন ৪ নম্বর ব্যক্তি বজলুর রহমানকে সভাপতি করা হলো এবং এতে আইনের লঙ্ঘন হয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) রায়হান কবির এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আলীনূর খান সরাসরি দায় এড়িয়ে যান।

তাঁরা বলেন, “আমাদের কাছে স্কুল থেকে ৩ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। পাশাপাশি বজলুর রহমান আলাদাভাবে আবেদন করেছিলেন তাঁর নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য। আমরা দুটি আবেদনই বোর্ডে পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় বা বোর্ড তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেহেতু তারা করেছে, এখানে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই।”

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে বজলুর রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ের বিষয়ে। বৈধ ৩ জন প্রার্থীর যোগ্যতা ইউএনও-এর মাধ্যমে কড়াভাবে যাচাই করা হলেও, বজলুর রহমানের কোনো কাগজই যাচাই করা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, “যাচাই করার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের, আমাদের কাজ শুধু আবেদন পাঠিয়ে দেওয়া। আমরা পাঠিয়ে দিয়েছি।”

অন্যদিকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) আলীনূর খান এক বিস্ফোরক স্বীকারোক্তিতে বলেন, “তিনি (বজলুর রহমান) তো ওই আবেদন ছাড়া আর কোনো কাগজ (শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ বা জীবনবৃত্তান্ত) আমাদের কাছে জমাই দেননি, আমরা যাচাই-বাছাই করব কীভাবে।” তাহলে কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাকে সভাপতি করা হলো কিনা—এমন প্রশ্নে এডিসি বলেন, “মন্ত্রণালয় বা বোর্ড যাচাই-বাছাই করেছে হয়তো, সেটা আমাদের বিষয় নয়। তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই।”

প্যানেলের বাইরে গিয়ে বিতর্কিত উপায়ে সভাপতি নির্বাচিত হওয়া এবং নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে স্থানীয়দের মনে ওঠা নানামুখী প্রশ্নের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ বজলুর রহমানের ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি।

পরবর্তীতে তাঁর বক্তব্য যুক্ত করার উদ্দেশ্যে ‘নারায়ণগঞ্জ সমাচার’-এর পক্ষ থেকে তাঁর নম্বরে একটি সুনির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক ক্ষুদে বার্তা (SMS/WhatsApp) পাঠানো হয়। কিন্তু এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি উক্ত ক্ষুদে বার্তার কোনো উত্তর (রিপ্লে) দেননি এবং তাঁর পক্ষ থেকে কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, মোহাম্মদ বজলুর রহমান দেশের অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপি, যার বি আর স্পিনিং মিলসের কাছে শুধু জনতা ব্যাংকেরই পাওনা প্রায় ৫৭৪ কোটি টাকা। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—যিনি ব্যাংকের টাকা আটকে রেখেছেন এবং যাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো কাগজ স্থানীয় প্রশাসন যাচাই করার সুযোগই পায়নি, তাঁকে কোন অদৃশ্য ইশারায় শিক্ষা বোর্ড এত বড় একটি স্কুলের সভাপতি বানিয়ে দিল?

এলাকার অভিভাবক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা জানিয়েছেন, এই বেআইনি কমিটি তাঁরা কোনোভাবেই মানবেন না। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া এই ব্যাক্তিকে চেয়ারে বসানোর পেছনে বোর্ডের যে কর্মকর্তারা ঘুস বা দুর্নীতি করেছেন, তাঁদের বিচার এবং এই অবৈধ কমিটি বাতিলের দাবিতে তাঁরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং হাইকোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছেন।