
আগামী ৫ আগস্ট জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পূর্তি সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, স্থানীয় প্রশাসন এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব স্থানীয়
পর্যায়েও কতটা প্রতিফলিত হয়েছে—তা নিয়েও নানা এলাকায় আলোচনা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলী ইউনিয়নে রাজনৈতিক প্রভাব, ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং স্থানীয় পরিবেশ নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির কয়েকজন নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও এলাকায় কিছু ব্যক্তি এখনও প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, এসব কারণে ইউনিয়নের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্থানীয়ভাবে পরিচিত রশিদ মেম্বার ওরফে ভাল্লুক রশিদ এবং মহিউদ্দিন নামের আরেক ব্যক্তি। অভিযোগকারীদের দাবি, তারা বিভিন্নভাবে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার এবং স্থানীয় পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব বণ্টনকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা ও বিতর্ক ছিল। এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, রশিদ মেম্বার দায়িত্বে থাকাকালে প্রত্যাশিতভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি এবং সে সময় ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা পেতে নানা ভোগান্তির মুখোমুখি হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, পরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পিংকি আক্তারকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে বলে তারা মনে করছেন।
বক্তাবলী ইউনিয়নের একজন প্রবীণ বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ কোনো রাজনৈতিক আধিপত্যের জায়গা না। এটা মানুষের প্রয়োজনের জায়গা। আগে মানুষ ছোট ছোট কাজ নিয়েও হয়রানির অভিযোগ করতো। এখন অন্তত অফিসে গেলে কাজ হবে কি না সেই আশা নিয়ে যায়।
আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, একজন চেয়ারম্যান বা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাজ হলো মানুষকে সেবা দেওয়া। জন্মসনদ, মৃত্যুসনদ, নাগরিক সনদ, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র—এসব ছাড়া এখন কোনো কাজ হয় না। সাধারণ মানুষ চায় অফিসে শান্তি থাকুক, সেবা বন্ধ না হোক।
একজন নারী বাসিন্দা বলেন, আগে ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় এবং অনিশ্চয়তা ছিল। এখন অন্তত নারী সদস্য হিসেবে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছে গিয়ে কথা বলা যায়। যদি আবার ঝামেলা শুরু হয় তাহলে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্থানীয় এক বিএনপি নেতা অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলালেও কিছু মানুষ স্থানীয়ভাবে আগের ধরনের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আমরা চাই প্রশাসন অভিযোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখুক এবং ইউনিয়ন পরিষদের কাজে কোনো ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করুক।
অন্যদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, ইউনিয়ন পরিষদকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘমেয়াদে এলাকার উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাদের মতে, বক্তাবলীর মতো এলাকায় মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া হচ্ছে স্থিতিশীল প্রশাসনিক পরিবেশ এবং নিরবচ্ছিন্ন নাগরিক সেবা।
তাদের ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদের কাজ শুধু রাজনৈতিক নয় এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একজন শিশুর জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে একজন নাগরিকের মৃত্যু সনদ, শিক্ষা, ব্যাংকিং, জমিজমা বা বিভিন্ন সরকারি সেবার ক্ষেত্রেও ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে।
এলাকার সচেতন নাগরিকদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে প্রশাসনের উচিত তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং একই সঙ্গে অভিযোগ যদি ভিত্তিহীন হয় তাহলে সেটিও স্পষ্ট করা। তারা মনে করেন, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয় ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালিত হওয়া উচিত আইন, প্রশাসনিক বিধান এবং জনস্বার্থের ভিত্তিতে।
স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা বক্তাবলীর মানুষ যেন সংঘাত নয়, স্বাভাবিক পরিবেশ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং নাগরিক সেবার নিশ্চয়তা পায়।







