সংকটকালের অর্থনীতিতে প্রস্তাবিত বাজেট সন্তোষজনক: বিকেএমইএ

14
সংকটকালের অর্থনীতিতে প্রস্তাবিত বাজেট সন্তোষজনক: বিকেএমইএ
সংকটকালের অর্থনীতিতে প্রস্তাবিত বাজেট সন্তোষজনক: বিকেএমইএ

বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় সংকটকালের অর্থনীতিকে আবারও ঘুরে দাঁড় করাতে ঘোষিত প্রস্তাবিত বাজেটকে সামগ্রিকভাবে সন্তোষজনক বলে আখ্যায়িত করেছে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। তবে বাজেটটি নীতিগত দিক থেকে ইতিবাচক হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শতভাগ সঠিক ও সহজ বাস্তবায়নের ওপর।

সম্প্রতি এক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিকেএমইএ’র সম্মানিত সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এই মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তিনি বাজেট প্রণয়নের জন্য বর্তমান সরকার, অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিশেষ ধন্যবাদ জানান।

বিকেএমইএ সভাপতি জানান, এবারের বাজেটে তৈরি পোশাক শিল্পের দুটি প্রধান প্রত্যাশা ছিল—করব্যবস্থার সংস্কার এবং চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে বিকল্প জ্বালানি সোলার সিস্টেমের (সৌরবিদ্যুৎ) আমদানি সহজীকরণ করা। দু’টি জায়গাতেই বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপসমূহ সন্তোষজনক। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, মাউন্টিং স্ট্রাকচার এবং সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর কর সুবিধা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি গঠনমূলক পদক্ষেপ।

এছাড়াও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিদ্যমান সুবিধাগুলো বহাল রাখা, বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার মেয়াদ ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো এবং রপ্তানিমুখী নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি ও দেশীয় বন্ডেড প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহের সুযোগ দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সংকটে থাকা ও বন্ধ কারখানার জন্য যে সহায়তা কর্মসূচি রাখা হয়েছে, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে শিল্প উৎপাদন পুনরুদ্ধার সম্ভব।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কার জায়গাটা হলো রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা। ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ট্যাক্স নেটের (করের আওতা) পরিধি যদি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো না যায়, তাহলে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। ফলে বর্তমানে যে অল্পসংখ্যক নিয়মিত ট্যাক্সধারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের ওপরই করের পুরো চাপটা এসে পড়বে বলে আমরা গভীরভাবে শঙ্কিত।

শিল্পখাতের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল উৎসে কর্তিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সমন্বয়, বহন বা ফেরতের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা। ফেরত প্রাপ্তিটা চেক অথবা ইনস্ট্রুমেন্টাল ফর্মে হতে পারে, যা প্রয়োজনে অন্যান্য সরকারি পাওনার সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে। বিষয়টি আরও স্পষ্টীকরণ করা প্রয়োজন। কারণ, উৎসে অগ্রিম কর কেটে নেওয়ার পর তা সময়মতো সমন্বয় বা ফেরত না হলে ব্যবসার কার্যকর মূলধন আটকে গিয়ে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয় এবং ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে।

পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার আমদানির ক্ষেত্রে ৫% ট্যাক্স আরোপের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি কতটুকু সময়োপযোগী বা বাস্তবসম্মত তা ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ দেশের একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান যা উৎপাদন করে, তা এই মুহূর্তে মোট চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম। দেশীয় উৎপাদনকে প্রোটেকশন দিতে গিয়ে যেন তৈরি পোশাক খাতের বৈশ্বিক প্রতিযোগী সক্ষমতা হারিয়ে বাজার হাতছাড়া না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

বাজেটে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে পর্যাপ্ত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিকেএমইএ। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ আংশিক সমাধান দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে।

পাশাপাশি উচ্চ ঋণসুদকে বিনিয়োগের পথে বড় বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঋণের ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নতুন বিনিয়োগ ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশকেও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা বজায় রাখতে হবে।

বিকেএমইএ’র আশা, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সহজ ও কার্যকর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এই বাজেট বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং শিল্প পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।