
রফিকুল ইসলাম জীবন :
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে সফল হিসেবে মূল্যায়ন করে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সমর্থনে ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হওয়াকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহলের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি সফল বিদেশ সফরের স্বীকৃতি নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সূচনার ইঙ্গিতও বহন করছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক অধিকাংশ সময়ই ছিল সংঘাত, অবিশ্বাস এবং মুখোমুখি অবস্থানের। জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়েও রাজনৈতিক বিভক্তি দৃশ্যমান হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বা কূটনৈতিক সাফল্যও প্রায়শই দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে উঠে আসতে পারেনি। সেই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সংসদে সর্বদলীয় ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।
সচেতন মহলের অভিমত, গণতন্ত্রের মূল শক্তি কেবল নির্বাচন নয়; বরং নির্বাচনের পর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা। এবারের জাতীয় নির্বাচনের পর সংসদীয় রাজনীতিতে যে তুলনামূলক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে, ধন্যবাদ প্রস্তাব তারই একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বিরোধী দলের কাজ শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়; বরং সরকারের ভালো উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয় সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়াও একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ। একইভাবে সরকারেরও উচিত বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনাকে গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা। সংসদে সাম্প্রতিক এই ঘটনা সেই ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অতীতে বহু সরকারপ্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফর করলেও সফর শেষে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে সংসদে এমন সর্বসম্মত ধন্যবাদ প্রস্তাবের নজির খুব কমই দেখা গেছে। বরং অর্জনকে খাটো করা, রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা কিংবা দলীয় অবস্থানের কারণে ইতিবাচক বিষয়কেও অস্বীকার করার প্রবণতা ছিল বেশি। সেই জায়গা থেকে বর্তমান পরিস্থিতি রাজনৈতিক পরিপক্বতার একটি লক্ষণ বলেই মনে করছেন অনেকে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ঘটনাকে ঘিরে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের মতে, দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। সরকার ও বিরোধী দল যদি জাতীয় প্রশ্নে একসঙ্গে অবস্থান নেয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হবে।
অনেকেই মনে করেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংঘাত, হরতাল, সহিংসতা ও অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব দেখেছে। ফলে জনগণ এখন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করে যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু শত্রুতা থাকবে না; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব পাস হওয়ার ঘটনা সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি পরিণত গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও রাষ্ট্রের স্বার্থে তারা সহযোগী। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সাফল্যের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য দেখা যায়। বাংলাদেশেও যদি সেই ধারা শক্তিশালী হয়, তবে তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
নারায়ণগঞ্জের সচেতন নাগরিকদের ভাষায়, দেশের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দল যদি একে অপরকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং গণতন্ত্রের অংশীদার হিসেবে দেখতে শেখে, তাহলে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে বেশি সময় লাগবে না।
তাদের মতে, জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সর্বদলীয় ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হওয়া হয়তো একটি প্রতীকী ঘটনা, কিন্তু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক গভীর। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনে নয়, বরং ভিন্নমতের মধ্যেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য গড়ে তোলার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত। আর সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বাংলাদেশের রাজনীতি হয়তো একটি নতুন অধ্যায়ের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।







