সমাজের সর্বত্র বিচারহীনতায় অসহায় সাধারন মানুষ

8
সমাজের সর্বত্র বিচারহীনতায় অসহায় সাধারণ মানুষ
সমাজের সর্বত্র বিচারহীনতায় অসহায় সাধারণ মানুষ

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে একটি অভিন্ন অভিযোগ, গরিব ও সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। থানা, পুলিশ, প্রশাসন, সামাজিক সালিশ কিংবা স্থানীয় নেতৃত্ব কোথাও গিয়ে মানুষ কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিচারহীনতা ও অনিশ্চয়তার এক গভীর বোধ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির বিস্তার। একসময় পরিবার, প্রতিবেশী কিংবা স্থানীয় বিরোধ সামাজিকভাবে মীমাংসা হতো। গ্রামের মাতব্বর, সমাজপতি কিংবা সম্মানিত ব্যক্তিরা নিরপেক্ষভাবে সমস্যার সমাধান করতেন। এতে সাধারণ মানুষকে থানার বারান্দা কিংবা আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হতো না।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সামাজিক কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ উঠেছে, সামাজিক বিচার-সালিশের ক্ষেত্রেও অর্থ ও প্রভাবের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীরা মনে করেন, সালিশ বৈঠকে ন্যায়বিচারের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আর্থিক সুবিধা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের কাছ থেকেই সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে বিরোধ নিষ্পত্তির পরিবর্তে তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে।

অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের হতাশা রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অর্থবিত্তসম্পন্নদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পাওয়া যায় না। মামলা, তদন্ত কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় সাধারণ মানুষ আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফলে অনেকেই ন্যায়বিচারের আশায় এগিয়ে না গিয়ে নীরবে অন্যায় মেনে নিতে বাধ্য হন।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিচারহীনতা শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট। কারণ একজন মানুষ যখন বারবার অন্যায়ের শিকার হয়েও প্রতিকার পায় না, তখন সে রাষ্ট্র, আইন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে। এর ফলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয় এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা, প্রতারণা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের হয়রানির ঘটনায় তারা সবচেয়ে বেশি অসহায় বোধ করেন। অনেকের মতে, টাকা ও পরিচয় ছাড়া বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

অনেক কৃষকের অভিযোগ, গরিব মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তার আর্থিক অসচ্ছলতা। ফলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের থাকে না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও মনে করেন, রাষ্ট্রের কাছে তারা নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করলেও অনেক সময় নিজেদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত মনে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি যখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ন্যায়বিচার। কারণ দুর্নীতি কেবল অর্থের লেনদেন নয়; এটি নৈতিকতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে সৎ ও দুর্বল মানুষ ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ে, আর প্রভাবশালী ও অসাধু গোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

তারা মনে করেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বিচার বিভাগের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নেতৃত্বের নৈতিক পুনর্গঠন। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে রাষ্ট্রকে।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি পরিমাপ করা হয় তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক কতটা নিরাপদ এবং কত দ্রুত ন্যায়বিচার পায় তার মাধ্যমে। কিন্তু যদি একজন সাধারণ মানুষ অন্যায়ের শিকার হয়ে কোথাও প্রতিকার না পান, তবে সেটি শুধু ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই একটি সতর্কবার্তা।

দেশের নানা প্রান্ত থেকে উঠে আসা অভিযোগগুলো তাই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে সাধারণ মানুষ কি সত্যিই ন্যায়বিচারের সমান সুযোগ পাচ্ছে, নাকি দুর্নীতি ও প্রভাবের ভারে সেই অধিকার ধীরে ধীরে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে? বিচারহীনতার এই দীর্ঘ ছায়া ক্রমেই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনেরও অন্যতম প্রধান শর্ত।