নেতারা পলাতক : প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতেও আওয়ামী লীগ শুন্য ছিলো নারায়ণগঞ্জ

75
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও আওয়ামী লীগ শূন্য ছিল নারায়ণগঞ্জ
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও আওয়ামী লীগ শূন্য ছিল নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ একসময় ছিল আওয়ামী লীগের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক ঘাঁটি। বিশেষ করে ওসমান পরিবারকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনীতি আবর্তিত হতো দীর্ঘ কয়েক দশক। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান উপস্থিতি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

এক সময় নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। তার পাশাপাশি ওসমান পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেন। সাবেক সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির এমপি সেলিম ওসমান রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি ও তার পরিবার আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতেন। শামীম ওসমানের ছেলে এবং ভাতিজাও জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন।

কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওসমান পরিবারের প্রায় সবাই নারায়ণগঞ্জ ও দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে যে পরিবারটি জেলার আওয়ামী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল, সেই কেন্দ্র এখন কার্যত শূন্য হয়ে পড়েছে।

জেলার আরেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন সাবেক মন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তার পরিবারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরাও দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। সাবেক এই সংসদ সদস্য গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান মুখ হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে উঠেছেন সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। সম্প্রতি তিনি কারামুক্ত হলেও এখনো সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। ফলে দলটির সাংগঠনিক পুনর্গঠনে তার ভূমিকা কী হবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, গত ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হলেও নারায়ণগঞ্জে তার উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব চোখে পড়েনি। শহর থেকে উপজেলা পর্যন্ত কোথাও বড় ধরনের কর্মসূচি বা সাংগঠনিক উপস্থিতি দেখা যায়নি বলে স্থানীয়দের অভিমত। অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি ছিল জেলার বিভিন্ন এলাকায়।

চাষাঢ়ার ব্যবসায়ী কাজী মহিউদ্দিন বলেন, এক সময় আওয়ামী লীগের নেতাদের নাম শুনলেই মানুষ রাজনীতির শক্তি বুঝতে পারত। এখন তাদের অধিকাংশ নেতা হয় কারাগারে, নয়তো দেশের বাইরে। সাধারণ কর্মীরা দিশাহীন অবস্থায় রয়েছেন।

ফতুল্লার এক পরিবহন শ্রমিকের মতে, কোনো রাজনৈতিক দল শুধু ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। যখন নেতৃত্বের বড় অংশ অনুপস্থিত হয়ে যায়, তখন সংগঠনও দুর্বল হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ এখন সেই বাস্তবতার মুখোমুখি।

সিদ্ধিরগঞ্জের কলেজ শিক্ষক অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন মোল্লা মনে করেন, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকট শুধু সাংগঠনিক নয়, নৈতিকও। তিনি বলেন, একটি বড় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঘটনা দলটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অভিঘাত তৈরি করেছে। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা তাদের জন্য সহজ হবে না।

বেসরকারী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুশফিক বলেন, নতুন প্রজন্ম এখন ভিন্ন ধরনের রাজনীতি দেখতে চায়। তারা জবাবদিহিতা, গণতান্ত্রিক চর্চা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতিকে গুরুত্ব দেয়। আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে ফিরে আসতে চায়, তাহলে তাদের সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক ভাষা ও নেতৃত্ব নিয়ে হাজির হতে হবে।

জেলার একজন প্রবীণ আইনজীবী বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ চার দশক ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ছিল প্রধান দুই শক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এখন প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্র নেতৃত্ব থেকে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোও মাঠে রয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেওয়া যায় না। তবে এটাও সত্য যে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি বর্তমানে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। জেলার শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ অনুপস্থিত, বহু নেতাকর্মী নিষ্ক্রিয়, আর সাধারণ সমর্থকরাও প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে অনাগ্রহী।

ফলে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এক সময়ের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ আদৌ কি আবার নিজেদের সংগঠিত করতে পারবে, নাকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অভিঘাত দলটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি ছাপ রেখে যাবে? জেলার অধিকাংশ সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া যায়, তা হলো আওয়ামী লীগের সামনে এখন শুধু সাংগঠনিক সংকট নয়, বরং আস্থা, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সংকটও রয়েছে। আর এই তিনটি সংকট একসঙ্গে কাটিয়ে ওঠাই হবে দলটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।