
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) ঠিকাদারি পাড়ার চিরচেনা সিন্ডিকেট ও সমঝোতার রাজনীতি বদলায়নি। এবার নাসিকের সদ্য প্রকাশিত মেগা অবকাঠামো উন্নয়নের ৮০টি কাজের সবকটিতেই টেন্ডার জমা দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সিটি কর্পোরেশনের ১১ নং ওয়ার্ডের সদ্য সাবেক কাউন্সিলর অহিদুল ইসলাম ছক্কু। তবে এর নেপথ্যে পর্দার আড়ালের গভীর রাজনৈতিক আঁতাত এবং এক অভিনব জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক এই কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা নাসিকের টেন্ডারগুলো ড্রপ করেছেন তাঁর আপন শ্যালক নাহিদ মাহমুদের ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই নাহিদ বর্তমানে নাসিকের ১১ নং ওয়ার্ডেরই ‘ওয়ার্ড সচিব’ হিসেবে কর্মরত আছেন এবং প্রতি মাসে সিটি কর্পোরেশন থেকে সরকারি বেতন-ভাতা তুলছেন।
সরকারি চাকরি বিধিমালা ও নাসিকের আইনি কাঠামোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শ্যালক-দুলাভাইয়ের এই মেগা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে বেশ কয়েকটি গুরুতর অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
১১ নং ওয়ার্ড সচিব মো. নাহিদ নিজেই ‘নারায়ণগঞ্জ সমাচার’র কাছে স্বীকার করেছেন যে, অহিদুল ইসলাম ছক্কু তার আপন দুলাভাই। তিনি ১১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হওয়ার পর নাহিদকে এই ওয়ার্ডের সচিব পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
টেন্ডার ড্রপ করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নাহিদ আরও দাবি করেন, আমি সিটি কর্পোরেশনে অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরি করি, তাই আমার নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স থাকা বা টেন্ডারে অংশ নিতে কোনো আইনি বাধা নেই।
তিনি আরও বলেন, আমি নিজে কোনো টেন্ডার ড্রপ করিনি, কাউন্সিলর সাহেব (দুলাভাই ছক্কু) আমার লাইসেন্স দিয়ে ড্রপ করেছেন।
তবে আইনি ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা নাহিদের এই দাবিকে সম্পূর্ণ অবৈধ, খামখেয়ালি এবং আইনি চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী, চাকরির ধরণ স্থায়ী হোক বা অস্থায়ী, দৈনিক ভিত্তিক (মাস্টাররোল) হোক বা চুক্তিভিত্তিক—সিটি কর্পোরেশনের তহবিল থেকে সুবিধা বা বেতনভোগী কোনো ব্যক্তিই ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো ধরনের ব্যবসায়িক দরপত্রে অংশ নিতে পারেন না।
আইনি বিধানের বিষয়ে জানালে তিনি বলেন, আমি এটাকে কোনো অপরাধ মনে করি না। নিয়মমতো না হলে সিটি কর্পোরেশনে টেন্ডার বাতিল করে দিবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে শ্যালককে সরকারি সংস্থায় চাকরি দেওয়া এবং পরবর্তীতে সেই শ্যালকের অফিশিয়াল পজিশন ও লাইসেন্স ব্যবহার করে দুলাভাইয়ের ৮০টি টেন্ডারের সবগুলোতে টেন্ডার ড্রপ করার এই ঘটনা সরাসরি দুর্নীতি দমন আইনের আওতাভুক্ত একটি গুরুতর অপরাধ।
একাই নাসিকের মেগা অবকাঠামো উন্নয়নের ৮০টি টেন্ডার ড্রপ করার বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অহিদুল ইসলাম ছক্কু বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি তো কাউকে টেন্ডার ড্রপ করতে বাধা দেই নি। এটা আমার আইনি অধিকার।
বিপুল অঙ্কের ব্যাংক ড্রাফটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঠিকাদারি ব্যবসায় ব্যাংকিং নিয়মে মাত্র ৫ লাখ টাকা ব্যাংকে জামানত দিয়ে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে ১ কোটি টাকার টেন্ডারে অংশ নেওয়া সম্ভব। আর সিটি কর্পোরেশনের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে ঠিকাদারি করায় আইনি কোনো বাধা নেই বলেও জানান সাবেক এই কাউন্সিলর। তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরিজীবী হলে কেবল পারা যায় না।
একাই ৮০টি টেন্ডার ড্রপ করার পর সবগুলো কাজ পেয়ে গেলে তা বাস্তবায়ন করার মতো জনবল বা আর্থিক সক্ষমতা ওনার আছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ছক্কু আরও বলেন, আর্থিক সাপোর্ট ব্যাংক দেবে। আর আমি মাত্র ৫টি কাজে লোয়েস্ট প্রাইস (সর্বনিম্ন দর) দিয়েছি। বাকি ৭৫টি কাজেই অন্যান্য ঠিকাদার আছে, অর্থাৎ সেখানে প্রচণ্ড কম্পিটিশন হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী সেখানে লটারি হবে। সুতরাং সব কাজ আমার একার পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই।
একজন সরকারি বেতনভুক্ত ওয়ার্ড সচিবের লাইসেন্সে ব্যাংক কীভাবে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যিক ঋণ (Work Order Loan) দেবে—সেই আইনি প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলেনি।







