
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণ নিয়ে আসন্ন গণশুনানিকে কেন্দ্র করে ফতুল্লা জুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কাশীপুর, ফতুল্লা ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের দাবি, এবারও যদি তাদের অধিকাংশ এলাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে রাখা হয়, তাহলে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য আরও প্রকট হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কুতুবপুর ইউনিয়নকে সম্পূর্ণভাবে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার প্রস্তাব ইতিবাচক হলেও, একই ধরনের নগর বাস্তবতায় থাকা পাশের তিন ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকাকে বাইরে রাখার যৌক্তিকতা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে গণশুনানিতে এই বিষয়টি সবচেয়ে বড় আলোচ্য ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ফতুল্লা এখন আর কোনো গ্রামীণ জনপদ নয়। এখানে শত শত শিল্পকারখানা, গার্মেন্টস, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ঘনবসতিপূর্ণ নগর পরিবেশ গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন লাখো মানুষ এই অঞ্চল ব্যবহার করলেও নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে তারা এখনো ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত সেবার ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারাও গণশুনানিতে ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের মতামত উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তাদের দাবি, প্রশাসনিক সীমারেখা নির্ধারণে বাস্তব নগরায়ন, জনসংখ্যা, শিল্পায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নাগরিক সেবার প্রয়োজনীয়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, ফতুল্লা দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল হলেও পরিকল্পিত সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পার্কিং, ফুটপাত ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের সংকট রয়েছে। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি শক্তিশালী নগর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করায় উন্নয়ন কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ফতুল্লাকে আংশিকভাবে সিটি করপোরেশনের আওতায় এনে বাকি অংশ ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে রাখলে প্রশাসনিক জটিলতা আরও বাড়তে পারে। একই এলাকার ভেতরে দুই ধরনের স্থানীয় সরকার কাঠামো কার্যকর থাকলে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, কর ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং নাগরিক সেবায় সমন্বয়হীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাদের মতে, ইতোমধ্যেই নারায়ণগঞ্জ শহরের সঙ্গে ফতুল্লার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সংযোগ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দুটি এলাকাকে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিচালনা করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতিদিন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসার প্রয়োজনে বিপুল সংখ্যক মানুষ শহর ও ফতুল্লার মধ্যে যাতায়াত করছেন।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, গণশুনানি শুধু আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকলে এর কোনো মূল্য থাকবে না। জনগণের মতামত গ্রহণ করে যদি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে মানুষের মধ্যে হতাশা আরও বাড়বে। তারা চান, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক এবং জনমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হোক।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, গণশুনানিতে শুধু প্রশাসনিক সুবিধা নয়, আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের নগর পরিকল্পনাকেও বিবেচনায় নেওয়া হবে। কারণ দ্রুত সম্প্রসারণশীল এই অঞ্চলকে এখনই পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, যানজট, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং পরিবেশ দূষণের মতো সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ফতুল্লার প্রশ্নটি এখন কেবল একটি ইউনিয়নের প্রশাসনিক অবস্থান নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি সমান নাগরিক অধিকার, শিল্পাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন এবং নারায়ণগঞ্জের ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তাই আসন্ন গণশুনানির সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান নয়, আগামী কয়েক দশকের উন্নয়নের গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে।







