এমপি দিপু ভূঁইয়ার চরম ব্যর্থতায় ঢাকার পেটে পূর্বাচল!

আরও ছোট হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ

118
আরও ছোট হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ! পূর্বাচল ইস্যুতে এমপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আরও ছোট হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ! পূর্বাচল ইস্যুতে এমপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

জাতীয় সংসদে নারায়ণগঞ্জকে ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলায় উন্নীত করার দাবি জানালেও বাস্তব ক্ষেত্রে নিজের নির্বাচনী এলাকা রূপগঞ্জ উপজেলার প্রধান অংশই ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া (দিপু)। মেগা প্রজেক্ট ‘পূর্বাচল নতুন শহর’ আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত হতে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রূপগঞ্জের পরিচিতি ও ভৌগোলিক অস্তিত্ব সংকুচিত হতে বসেছে। এই ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের চরম রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও রূপগঞ্জের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

নিজ দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও দেশের সবচেয়ে ছোট জেলা নারায়ণগঞ্জের ভূখণ্ড আরও ছোট হয়ে যাওয়ার পেছনে এমপির নীরব ভূমিকা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক ও স্থানীয় সচেতন মহল।

সংসদ সদস্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নেতারা জানান, যেখানে নির্বাচনী এলাকা ও জেলার সীমানা রক্ষার মতো বড় সংকট তৈরি হয়েছে, সেখানে স্থানীয় এমপি কেবল নীরব ভূমিকা পালন করছেন। তারা বলছেন—সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেওয়া সহজ, কিন্তু রাজউক বা নিকার (ঘওঈঅজ)-এর মতো জায়গায় গিয়ে রূপগঞ্জের দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা এবং টেকনিক্যাল যুক্তি দিয়ে পূর্বাচলকে নারায়ণগঞ্জে রাখার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন এমপি দিপু ভূঁইয়া। নিজ দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক সিদ্ধান্ত আটকে দিতে না পারা তাঁর চরম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।

বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী নারায়ণগঞ্জ মহানগরীর আমীর মাওলানা আব্দুল জব্বার বলেন, “স্থানীয় এমপি এই অংশটিকে নারায়ণগঞ্জে রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। এটা হয়তো বিগত সরকারের আমলেরই মাস্টারপ্ল্যান ছিল, কিন্তু এখন তো উনার নিজের দল ক্ষমতায়! তাহলে উনি কেন এটা নারায়ণগঞ্জে রাখতে পারলেন না?”*

তিনি আরও যোগ করেন, *”সংসদে দাঁড়িয়ে উনি বলছেন নারায়ণগঞ্জকে ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলা করতে হবে, অথচ বাস্তবে উনি নারায়ণগঞ্জকে ছোট হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারছেন না! ঢাকার ওপর এমনিতেই মানুষের চাপ বেশি, পূর্বাচলকে ঢাকার সাথে যুক্ত না করে নারায়ণগঞ্জের অধীনে রাখলে নারায়ণগঞ্জের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হতো এবং ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলা হওয়া সহজ হতো। কিন্তু উনার নিজের উপজেলা রূপগঞ্জ ছোট হওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের জেলাটি আরও ছোট হয়ে গেল। এখানে স্থানীয় এমপি পুরোপুরি ব্যর্থ।”*

তবে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, *”আদি নিবাস হিসেবে অনেকেই নারায়ণগঞ্জের সাথে থাকতে চান, আবার অনেকে ভাবছেন ঢাকায় গেলে হয়তো নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বেশি পাওয়া যাবে।”

একই সুর মিলিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নারায়ণগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক জুবায়ের সরদার বলেন, “স্থানীয় এমপি সরকারকে বোঝাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন যে এই ভূখণ্ড নারায়ণগঞ্জে রাখাই দেশের স্বার্থে দরকার ছিল। এমনিতেই দেশের সবচেয়ে ছোট জেলা নারায়ণগঞ্জ, সেটিকে আরও ছোট করার এই পদক্ষেপ নারায়ণগঞ্জের ভবিষ্যতের জন্য মোটেই শুভকর নয়।”

এনসিপির মহানগরীর আহ্বায়ক শওকত আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের রূপগঞ্জের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় এমপি এখানে চরমভাবে ব্যর্থ। তিনি নিজের উপজেলাই ধরে রাখতে পারেননি, উল্টো এলাকাকে আরও ছোট করা হয়েছে। সরকারকে যুক্তিসঙ্গতভাবে বোঝাতে না পারার পুরো দায়ভার উনার কাঁধেই বর্তায়।”

বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা এনসিপির সমন্বয়ক ইউসুফ হোসাইন বলেন, “পূর্বাচল নতুন শহর রাজউকের প্রজেক্ট হতে পারে, কিন্তু এর মা মাটি ও ভৌগোলিক ইতিহাস রূপগঞ্জের। এটি কেটে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা পূর্বাচলকে নারায়ণগঞ্জের অংশ হিসেবেই দেখতে চাই। রূপগঞ্জের মাটি ও মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেব না।”

এদিকে বিষয়টিতে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, “স্থানীয় সাধারণ মানুষ যদি নিজেরা উদ্যোগী হয়ে ঢাকায় যেতে চায়, সে ক্ষেত্রে তো আর কিছু করার থাকে না। ঢাকায় যুক্ত হলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বেশি মিলবে—এমন ভাবনা থেকে হয়তো স্থানীয়দের একাংশ ঢাকার সাথে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের নির্বাচনী এলাকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অর্থনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন ভূখণ্ড রক্ষা করতে না পারার এই ব্যর্থতার দায়ভার থেকে এমপি দিপু ভূঁইয়া কোনোভাবেই রেহাই পেতে পারেন না। রূপগঞ্জের সচেতন জনগণ এখন তাঁর কাছ থেকে স্পষ্ট জবাব চায়।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া (দিপু)-র সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বার্তা (মেসেজ) পাঠানো হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো মতামত পাওয়া যায়নি।