
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে পলাতক আজমেরী ওসমানের নামে অনুষ্ঠিত ঝটিকা মিছিলগুলো নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করে এসব মিছিল দেখা যাচ্ছে। মিছিলগুলোতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগের ব্যানার ও স্লোগানও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে আজমেরী ওসমানসহ ওসমান পরিবারের প্রভাবশালী সদস্যরা দেশ ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। এরপর থেকে তারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেননি। তবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব ঝটিকা মিছিল করছে, নারায়ণগঞ্জে আজমেরী ওসমানের নামে হওয়া মিছিলগুলোকে সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এসব মিছিলের খবর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে এসব কর্মসূচির সমালোচনা করছেন। তাদের দাবি, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব মিছিল সংগঠিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে এ বিষয়ে তেমন কোনো দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের একটি অংশ মনে করেন, আজমেরী ওসমানের নামে মিছিল হওয়া বা না হওয়া মূল প্রশ্ন নয়। বরং আগামী দিনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেক বেশি নির্ভর করবে বর্তমান সরকারের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার ওপর।
তাদের মতে, ইতিহাস বলে কোনো রাজনৈতিক দলের উত্থান-পতন কেবল বিরোধী দলের সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; ক্ষমতাসীনদের কর্মদক্ষতা, জনসন্তুষ্টি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা পালন করে। বর্তমান সরকার যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের একটি অংশের আগ্রহ পুনরায় তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সরকার যদি সফলভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জনভোগান্তি কমাতে সক্ষম হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
সচেতন মহলের অনেকে মনে করেন, বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি মানুষের অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। এসব বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি না হলে সরকারকে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
তাদের আরও পর্যবেক্ষণ হলো, বর্তমান সরকারের সম্ভাব্য ব্যর্থতার রাজনৈতিক সুবিধাভোগী জামায়াত বা এনসিপি হবে—এমন ধারণা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘদিনের সংগঠিত শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগই সেই অসন্তোষের একটি অংশকে নিজেদের পক্ষে টানার সুযোগ পেতে পারে।
এ কারণে অনেকের মতে, নারায়ণগঞ্জে আজমেরী ওসমানের নামে হওয়া ঝটিকা মিছিলগুলোকে কেবল বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো মূলত দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা, বর্তমান সরকারের কার্যকারিতা এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে চলমান বিতর্কেরই একটি প্রতিফলন। তবে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান হবে কিনা, তার উত্তর নির্ভর করবে মাঠের মিছিলের চেয়ে জনগণের জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের সামগ্রিক কর্মদক্ষতার ওপরই।







