আইভী ছিলেন আ.লীগের সম্পদ, তাঁর কোনো দলের প্রয়োজন ছিল না

111
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে—ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর রাজনৈতিক অবস্থান ও জনপ্রিয়তার প্রকৃত ভিত্তি কোথায়? তিনি কি মূলত দলীয় সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, নাকি তাঁর রাজনৈতিক শক্তির উৎস সাধারণ মানুষের সমর্থন?

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, আইভীর রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে কোনো বিশেষ দলের অবদান নয়, বরং নারায়ণগঞ্জের মানুষের আস্থা ও সমর্থনই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তাঁর এই মন্তব্য স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১১ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত আইভীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি ছিল। তাঁর মতে, ওই নির্বাচনে পরাজিত হলে আইভীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। পরবর্তী সময়ে দলীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ, সমালোচনা ও নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

পন্টির মূল্যায়নে, শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণেই আইভীকে গ্রহণ করতে বাধ্য হন। কারণ নারায়ণগঞ্জে তাঁর জনপ্রিয়তা উপেক্ষা করা সহজ ছিল না। একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, আইভীর জনপ্রিয়তাকে পরবর্তীকালে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারও করা হয়েছে।

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার রাজনীতিতে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, আইভীর জনপ্রিয়তা গড়ে উঠেছে নাগরিক বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা, প্রশাসনিক দৃশ্যমানতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে জনসংযোগ বজায় রাখার মাধ্যমে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে কেবল দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা কঠিন।

অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতাও বলছে, জাতীয় পর্যায়ের একটি বড় দলের সাংগঠনিক সমর্থন ছাড়া দীর্ঘ সময় প্রভাবশালী অবস্থানে টিকে থাকা সহজ নয়। ফলে আইভীর রাজনৈতিক সাফল্যে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং দলীয় সমর্থন—উভয় উপাদানের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষণ।

পোস্টের শেষ অংশে পন্টি মন্তব্য করেন, ভবিষ্যতে যদি আওয়ামী লীগ আবারও রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসে, তবে নারায়ণগঞ্জে আইভী শেখ হাসিনার প্রথম পছন্দ নাও হতে পারেন। তাঁর এই বক্তব্য মূলত দলটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।

এদিকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। দলটি বর্তমানে যেসব রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, সাংগঠনিক সংকট এবং জনমতের চাপের মুখোমুখি, সেগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারলে ভবিষ্যতে দলটির জন্য পুনরায় শক্তিশালী অবস্থানে ফেরা কঠিন হতে পারে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, বড় রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে নতুন কৌশল ও নেতৃত্বের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে নেতৃত্বের পুনর্গঠন, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর।

পন্টির পোস্টের মূল বক্তব্য হলো, আইভীর রাজনৈতিক পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের মানুষ। দলীয় সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁর জনপ্রিয়তার প্রধান উৎস জনগণ—এমন ধারণাই তিনি তুলে ধরেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং দলীয় শক্তির সমন্বয়ই একজন নেতার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ধারণ করে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।